Wednesday, June 26, 2024

দাদন আর ঋণের জালে যেভাবে আটকা পড়েছেন গৌর জলদাস


 গৌর জলদাসের ঘরের চালের ফুটো ঢাকতে দেওয়া হয়েছে প্লাস্টিক। গত মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরা উত্তর জেলে পাড়া এলাকায়প্রথম আলো।

দুই ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে জরাজীর্ণ একটি টিনের ঘরে বসবাস গৌর জলদাসের (৪০)। ঘরের টিনের ছাউনি জং ধরে ফুটো হয়ে গেছে। সাগরে মাছ ধরে সংসারের খরচ মেটান গৌর জলদাস। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় এখন অনেকটা বেকার তিনি। অভাবে-অনটনে দিন কাটছে তাঁর।

গৌর জলদাসের বাড়ি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরা ইউনিয়নের উত্তর জেলেপাড়ায়। গত মঙ্গলবার তাঁর বাড়িতে গেলে তিনি বলেন, ‘হাতে টাকা নেই। দোকানে বাকি পড়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। এ ছাড়াও ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়ে দাদনের জালে আটকে আছি। বড় ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। নিয়মিত পড়াশোনার খরচও দিতে পারি না।’

সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় গৌর জলদাসের মতো অভাব-অনটনে দিন কাটছে সীতাকুণ্ডের প্রায় ৭ হাজার জেলে পরিবারের। গৌর জলদাসের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, তখন সেখানে এলাকার প্রায় ৩০ জন জেলে উপস্থিত হন। সবাই তুলে ধরছিলেন নিজেদের দুর্দশার কথা।

গৌর জলদাস বলেন, বঙ্গোপসাগরের সন্দ্বীপ চ্যানেলে ইলিশের মৌসুমে নতুন-পুরোনো মিলিয়ে ২০টি জাল বসিয়ে মাছ ধরেন তিনি। নৌকা ও জাল মেরামত এবং চারজন শ্রমিকের বেতনের টাকা মৌসুমের শুরুতেই মহাজন থেকে ঋণ নিয়ে জোগাড় করতে হয়। মাছ ধরা যখন বন্ধ থাকে, তখন দাদন নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। সরকারি সহযোগিতার চাল পান না তিনি।

উত্তর জেলেপাড়া গ্রামের সরদার শ্যামবন্ধু জলদাস বলেন, গ্রামের সরদার তিনি। তাই অন্যদের মতো দিনমজুরি করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না। জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে পাইকারি ও খোলাবাজারে বিক্রি করে সংসারের খরচ সামাল দিয়ে আসছেন। সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ব্যবসা বন্ধ। তিনি বলেন, ‘দুই মেয়ে ও এক ছেলের বাবা আমি, এই দুর্দিনে কষ্টের কথা কাউকে মুখ ফুটে বলতেও পারি না।’

সুমঙ্গল জলদাস নামের পাড়ার আরেক জেলে বলেন, দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাঁর পাঁচজনের সংসার। মাছ ধরে সংসারের খরচ চালাতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই গত বছর অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক ছেলের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন মাঝেমধ্যে ওই ছেলে কাঠমিস্ত্রির জোগালির কাজ করে।

মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা থাকায় জেলে পাড়ার জেলেরা এখন কর্মহীন। ঘাটে বাধা রয়েছে সারি সারি নৌকা। গত মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরা খালে
মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা থাকায় জেলে পাড়ার জেলেরা এখন কর্মহীন। ঘাটে বাধা রয়েছে সারি সারি নৌকা। গত মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কুমিরা খালে
প্রথম আলো

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সীতাকুণ্ডে সরকারি তালিকাভুক্ত জেলে পরিবার রয়েছে ৫ হাজার ৪৪০টি। এর মধ্যে সহযোগিতা পায় ৪ হাজার ৮০৫টি পরিবার। বছরে মা ইলিশ নিধন বন্ধে ২২ দিন ও জাটকা নিধন বন্ধে ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকে। এখন চলছে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা।

মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, সীতাকুণ্ডের কুমিরা খালে ইলিশ ধরার নৌকাগুলো সারবদ্ধভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে। বেড়িবাঁধ এলাকায় অন্তত ১০টি স্থানে ছেঁড়া জাল মেরামতের কাজ করছেন ২০ জেলে। নৌকা মেরামত করতে দেখা যায় পাঁচ থেকে সাতজন ব্যক্তিকে।

উপজেলার সলিমপুর, ভাটিয়ারী ও সোনাইছড়ির মদনাহাট এবং বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের জেলেপাড়াগুলো ঘুরে দেখা যায়, পাড়ার ভেতরে চায়ের দোকানে খোশগল্পে মেতে রয়েছেন জেলেরা। তাঁরা বলেন, পাড়ার অনেক যুবক জাহাজভাঙা কারখানায় দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন। তবে প্রতিদিন কাজ পাওয়া যায় না। বেশির ভাগ জেলে সাগরে মাছ ধরা, মাছ বিক্রি ছাড়া অন্য কোনো কাজ জানেন না। ফলে তাঁদের বেকার থাকতে হচ্ছে।

জেলেরা জানান, জাটকা নিধন বন্ধে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞার পর তাঁরা ইলিশ ধরার জন্য সাগরে নামার অনুমতি পান। দুই মাস ইলিশ ধরার পর মা ইলিশের ডিম ছাড়ার জন্য আবার ২২ দিনের বন্ধ দেওয়া হয়। এরপর ১৫-২০ দিন মাছ ধরতে পারেন। পরে আর ইলিশ তেমন ধরা পড়ে না।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, জেলেরা যাতে বেকার না হন, তাই তাঁদের বিকল্প কর্মসংস্থানের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিছু জেলেকে বিনা মূল্যে গরু-ছাগল দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সীতাকুণ্ডের ২ হাজার ৬০০ জেলে পরিবারকে বছরে চার দফায় ৪০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। এর বাইরে ৫ হাজার ৪৪০ পরিবারকে নিষেধাজ্ঞার সময় আরও তিন দফায় ১০৫ কেজি করে চাল সহযোগিতা করা হচ্ছে।

সহায়তার চাল আটকানোর অভিযোগ

গত মে মাসে ৪০ কেজি করে চাল পাওয়ার কথা সীতাকুণ্ডের ২ হাজার ৬০০ জেলে পরিবারের। চালের পরিমাণ ১০৪ মেট্রিক টন। তবে জেলেরা এই চাল পাননি। জেলেদের দাবি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও মৎস্য বিভাগ থেকে ৪০ কেজি করে চাল পাওয়ার জন্য সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়। এ পরিস্থিতিতে অন্তত ২০০ জেলে নিবন্ধন করেন। তবে তাঁদের চালও দেওয়া হয়নি।

মদনাহাট এলাকার জেলে সরদার সুনীল জলদাস প্রথম আলোকে বলেন, মৎস্য বিভাগ থেকে তাঁদের জানানো হয়েছে, পেনশন স্কিমে নিবন্ধন করতে দেরি করায় চাল ফেরত গেছে। এ বিষয়ে সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়।

জানতে চাইলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামাল উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ইউএনও কার্যালয় থেকে খাদ্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে চালের চাহিদা পাঠাতে দেরি হওয়ায় চাল দিতে সমস্যা হচ্ছে। খাদ্য কর্মকর্তা মে মাসের চাল জুনে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছেন। তা ছাড়া তাঁর দপ্তর থেকেও প্রধান কার্যালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, জেলেদের সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নিবন্ধন করতে বলা হয়েছে তা ঠিক। তবে এর জন্য সহযোগিতার চাল আটকানো হয়নি। উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা তাঁকে না জানিয়ে মাসিক হিসাব পাঠিয়ে দিয়েছেন, যার কারণে জটিলতা দেখা দেয়।

Tuesday, June 25, 2024

গভীর রাতে ছাদ ফুটো করে চার ফাঁসির আসামির পলায়ন

 



বগুড়া জেলা কারাগার থেকে গতকাল গভীর রাতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি ছাদ ফুটো করে দেয়াল পার হয়ে পালিয়েছিলেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আজ সকালে তাঁদের কারাগারের আশপাশের এলাকা থেকে আটক করা হয়। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।

বগুড়া জেলা কারাগারের জেলার মোহাম্মদ ফরিদুর রহমান প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘চারজনই ফাঁসির আসামি। তাঁরা পালিয়েছিলেন। আমরা কারাগারের পাশেই তাঁদের পেয়েছি।’





বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) স্নিগ্ধ আখতার (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি অনেক স্পর্শকাতর। পুলিশ সুপার এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন।’

পুরো ঘটনা জানতে কারা মহাপরিদর্শকসহ (আইজি-প্রিজন) সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে কেউই সাড়া দেননি।

আজ সকাল আটটা পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামির নাম জানা যায়নি। তবে তাঁদের গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।


Tuesday, June 11, 2024

আনোয়ারুল হত্যা: আক্তারুজ্জামানের দুটি গাড়ি গুলশানের বাসা থেকে জব্দ


সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম খুনের মূল পরিকল্পনাকারী আক্তারুজ্জামান শাহীনছবি: সংগৃহীত

সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম খুনের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত আক্তারুজ্জামানের দুটি গাড়ি জব্দ করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। রাজধানীর গুলশানে আক্তারুজ্জামানের ভাড়া বাসার গ্যারেজ থেকে গত শনিবার গাড়ি দুটি জব্দ করা হয়। গাড়ি দুটির মধ্যে একটি সাদা রঙের প্রাডো মডেলের; অন্যটি মাইক্রোবাস।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত শনিবার বিকেলে ডিবির একটি দল গুলশানে আক্তারুজ্জামানের ভাড়া বাসায় অভিযান চালায়। পরে বাসার নিচতলার গ্যারেজের থাকা আক্তারুজ্জামানের সাদা রঙের প্রাডো গাড়ি জব্দ করা হয়। একই গ্যারেজ থেকে আরেকটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসও জব্দ করা হয়।

আমরা সত্যের কাছাকাছি এসে গেছি। মরদেহটি শনাক্ত হলেই অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারব।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ওই ভবনের এক বাসিন্দার গাড়িচালক আবদুল খালেক গতকাল রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বছর দেড়েক আগে গুলশান–২ নম্বরের ৬৫ নম্বর সড়কের ১৭ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলার একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেন আক্তারুজ্জামান। দুদিন আগে পুলিশ বাসার নিচতলার গ্যারেজ থেকে আক্তারুজ্জামানের দুটি গাড়ি জব্দ করে নিয়ে যায়।

আরও পড়ুন

আবদুল খালেক বলেন, ঢাকায় থাকলে গাড়ি দুটি ব্যবহার করতেন আক্তারুজ্জামান।

গত ১৩ মে কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে খুন হন ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম।

এদিকে আনোয়ারুল আজীম খুনে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া চারজনের মুঠোফোনের ফরেনসিক পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল সোমবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এই আদেশ দেন।

আদালতে দেওয়া ডিবির আবেদনে বলা হয়েছে, আনোয়ারুল আজীম খুনের ঘটনায় করা মামলায় আলামত হিসেবে চরমপন্থী নেতা শিমুল ভূঁইয়া, ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক কাজী কামাল আহমেদ ওরফে বাবু, শিমুলের ভাতিজা তানভীর ভূঁইয়া ও শিলাস্তি রহমানের মুঠোফোন জব্দ করা হয়েছে। খুনের পর তাঁরা নিজেদের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন রকম তথ্য আদান-প্রদান করেছেন।

আরও পড়ুন

ডিবি আদালতকে বলেছে, সংসদ সদস্য খুনের রহস্য উদ্‌ঘাটনের জন্য গ্রেপ্তার চার আসামির মুঠোফোনের কথোপকথন, মুঠোফোনের কল রেকর্ড এবং কী ধরনের তথ্য তাঁরা আদান-প্রদান করেছেন, তা জানা জরুরি। এ ছাড়া আসামিদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে এবং মুঠোফোনে থাকা ছবি, ভিডিওসহ অপহরণ ও খুন-সংক্রান্ত কোনো তথ্য মুছে ফেলা হয়েছে কি না, সেটি জানা প্রয়োজন।

জব্দ করা মুঠোফোনগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষার অনুমতি চেয়ে ডিবির করা আবেদন গতকাল মঞ্জুর করেছেন আদালত।

সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম খুনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১২ জনের সম্পৃক্ততা পেয়েছে ডিবি। এর মধ্যে খুনের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত মো. আক্তারুজ্জামান ২০ মে ঢাকা থেকে প্রথমে দিল্লি যান। সেখান থেকে নেপালের কাঠমান্ডু যান তিনি। এরপর দুবাই হয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেছেন বলে ডিবির তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানতে পেরেছে।

আরও পড়ুন

খুনের ঘটনায় সন্দেহভাজন অন্য আসামিদের মধ্যে মো. সিয়াম হোসেন নেপালে আটক হন। এখন তিনি কলকাতা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। আরেক আসামি ‘কসাই’ নামে পরিচিত জিহাদ হাওলাদারও ভারতের কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁরা হলেন শিমুল ভূঁইয়া, তাঁর ভাতিজা তানভীর ভূঁইয়া, শিলাস্তি রহমান ও কাজী কামাল। এর মধ্যে প্রথম তিনজন অপরাধ স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। পলাতক থাকা অন্য আসামিরা হলেন মোস্তাফিজুর রহমান, ফয়সাল আলী সাজি, চেলসি চেরি ওরফে আরিয়া, তাজ মোহাম্মদ খান ওরফে হাজি ও মো. জামাল হোসেন।

আরও পড়ুন

গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের মধ্যে এখন কাজী কামালকে গতকাল থেকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করছে ডিবি। তাঁকে সাত দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।

এখন তিনি কলকাতা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। আরেক আসামি ‘কসাই’ নামে পরিচিত জিহাদ হাওলাদারও ভারতের কলকাতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন।

সংসদ সদস্য খুনের ঘটনায় আরও অনেকেই গ্রেপ্তার হতে পারেন বলে গতকাল সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। খুনের তদন্ত সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যের কাছাকাছি এসে গেছি। মরদেহটি শনাক্ত হলেই অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারব।’


Tuesday, May 14, 2024

ডলার-সংকট ঠেকানো যাচ্ছে না রিজার্ভের পতন


 দুই বছর আগে দেশে শুরু হওয়া ডলারের সংকট কাটছে না। বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বাড়াতে সাম্প্রতিক সময়ে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেগুলো রিজার্ভ বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। ডলারের সংকট না কাটায় রিজার্ভের পতন ঠেকানো যাচ্ছে না; বরং প্রায় প্রতিনিয়তই কমছে রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। 

এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নে (আকু) মার্চ ও এপ্রিল মাসের দায় মেটানোর পর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে মোট রিজার্ভ কমে ২৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৩৭৭ কোটি ডলারে নেমে এসেছে। আর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাবপদ্ধতি বিপিএম ৬ অনুযায়ী রিজার্ভ এখন ১৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৮৩২ কোটি ডলার। তবে প্রকৃত বা দায়হীন রিজার্ভ এখন ১৩ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের কিছুটা কম বলে জানা গেছে। প্রকৃত রিজার্ভ সেটাই, যার বিপরীতে কোনো দায় নেই এবং যেকোনো সময় তা ব্যবহার করা যায়। 

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এখন আমদানি নিয়ন্ত্রণের পরও প্রতি মাসে আমদানি দায় মেটানোর জন্য গড়ে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে প্রকৃত রিজার্ভের অর্থ দিয়ে তিন মাসেরও আমদানি খরচ মেটানো যাবে না।

অর্থনীতিবিদেরা মনে করছেন, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত আশঙ্কাজনক পর্যায়ে নেমেছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দেশের আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য ভালো পরিমাণ রিজার্ভ থাকা জরুরি। এখন রিজার্ভ যে পর্যায়ে নেমে এসেছে, তা নিয়ে যথেষ্ট শঙ্কার কারণ আছে। কারণ, এই রিজার্ভ দিয়ে দেশের তিন মাসেরও আমদানি দায় মেটানো যাবে না। ভারতের ১২-১৩ মাস ও ভিয়েতনামের ৭-৮ মাসের আমদানি দায় মেটানোর মতো রিজার্ভ আছে।

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে দেশের কাঙ্ক্ষিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব না। উৎপাদন বাড়িয়ে ভালো জিডিপি অর্জন করতে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি বাড়াতে হবে। এ জন্য আমদানি ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হবে। 

আরও পড়ুন

রিজার্ভ কমল কীভাবে 

জানা গেছে, গত সপ্তাহে আকু (এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন) বিল বাবদ রিজার্ভ থেকে ১৬৩ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়। ফলে রিজার্ভ আরও কমে যায়। 

আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দেওয়া নিট বা প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ১১ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের অনুরোধের পর আইএমএফ এ লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ১ হাজার ৪৭৫ কোটি ডলারে নামিয়েছে। তবে প্রকৃত এই রিজার্ভ এখন ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের কম। ফলে এখনো লক্ষ্য অর্জনের বেশ দূরে রয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার প্রকৃত মজুত। 

২০২১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট রিজার্ভ ৪ হাজার ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব হিসাবেই যা এখন কমে হয়েছে ২ হাজার ৩৭৭ কোটি ডলার। ফলে আড়াই বছরে রিজার্ভ কমে অর্ধেক হয়েছে।

ডলারের দাম একসময় নির্ধারণ করত কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপর ব্যাংক খাত–সংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানকে বিনিময় হার নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নানা পরীক্ষা–নিরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার পর ডলারের দাম নির্ধারণে এবার ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ডলারের দাম ক্রলিং বা ওঠানামা করার সুযোগ রাখেনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, চলতি মাসের প্রথম ১২ দিনে ৯০ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। ক্রলিং পেগ চালু করে ডলারের দাম বাড়িয়ে ১১৭ টাকা করা হয়েছে, এ বাস্তবতায় প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়বে বলে আশা করছেন কর্মকর্তারা। এ ছাড়া ডলারের দাম বাড়ায় রপ্তানি আয় আসাও বাড়বে বলে কর্মকর্তারা মনে করেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখন সরকারি আমদানি দায় মেটানোর জন্য প্রতি ডলার ১১৭ টাকা ৪৪ পয়সা দরে বিক্রি করছে। আবার যেসব ব্যাংক বেশি দামে প্রবাসী আয় কিনছে, তাদের ডলার বাংলাদেশ ব্যাংক ১১৭ টাকা ৪৪ পয়সা দরে কিনে নিচ্ছে। এরপরও রিজার্ভের পতন ঠেকানো যাচ্ছে না। যে পরিমাণ ডলার বিক্রি করা হচ্ছে, কেনা হচ্ছে তার চেয়ে কম। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক প্রথম আলোকে বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত দুই মাসে ১৬৩ কোটি ডলার আমদানি বিল পরিশোধ করেছে। ফলে রিজার্ভ কিছুটা কমেছে। সামনের মাসে আইএমএফের ঋণের কিস্তি আসবে। এ ছাড়া জুনের মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্পের অর্থছাড় হবে। তিনি আশা করেন, প্রবাসী আয় চলতি মাসে ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। ডলারের প্রবাহ বাড়ার কারণে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রির চাপও কমে আসবে। 

আরও পড়ুন

আর্থিক হিসাবেও বড় ঘাটতি 

এদিকে দেশের আর্থিক হিসাবে ঘাটতি ৯ বিলিয়ন বা ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ প্রান্তিকে ঘাটতির পরিমাণ ৯২৫ কোটি ডলারে উঠেছে। এর আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই সময়ে আর্থিক হিসাবে ঘাটতি ছিল ৪০৯ কোটি ডলার।

একটি দেশের আন্তর্জাতিক সম্পদের মালিকানা হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়টি পরিমাপ করা হয় আর্থিক হিসাবের মাধ্যমে। সাধারণত এই হিসাবে ঘাটতি তৈরি হলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। ডলার-সংকট তীব্র হয়ে ওঠায় দেড় দশকের মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরের শুরুতে প্রথমবারের মতো এ হিসাবে ঘাটতি দেখা দেয়।

বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়াসহ কয়েকটি কারণে ঘাটতি বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। যেমন প্রবাসীরা পুঁজিবাজার বা অন্য খাতে আগের চেয়ে কম বিনিয়োগ করছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগ উঠিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আবার যে পরিমাণ পণ্য রপ্তানি হচ্ছে, তার বিপরীতে দেশে আয় আসা কমেছে।

আরও পড়ুন

আর্থিক হিসাবের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই), পোর্টফোলিও বিনিয়োগ, অন্যান্য বিনিয়োগ ও রিজার্ভ অ্যাসেট বিবেচনা করা হয়ে থাকে। অন্যান্য বিনিয়োগের মধ্যে রয়েছে বৈদেশিক সহায়তা, সরকারের মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, ঋণের কিস্তি পরিশোধ, দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণ, ট্রেড ক্রেডিট বা রপ্তানির বিপরীতে প্রত্যাবসিত অর্থ এবং অন্যান্য সম্পদ ও দায়।

ডলারের দামকে পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়ে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, সময়মতো ডলারের দাম বাজারভিত্তিক না করা ও পুরো রপ্তানি আয় দেশে না আসায় সংকট যাচ্ছে না। বাণিজ্যঘাটতি কাটছে না, আর্থিক হিসাবেও ঘাটতি বাড়ছে। ফলে ডলার–সংকট কাটছে না ও রিজার্ভের পতন হচ্ছেই। ডলারের দাম নির্ধারণে যে ধরনের নীতি নেওয়া হয়েছে, তার কোনোটাই টেকসই হচ্ছে না। এখন নতুন পদ্ধতিও বাজারভিত্তিক না। ডলারকে চাহিদা-জোগানের সঙ্গে ওঠানামা করতে দিতে হবে। ব্যাংকগুলোকে প্রতিদিন দামের ঘোষণা দিতে হবে, এতে গ্রাহকেরা পরিষ্কার ধারণা পাবেন। ডলার–সংকট নিরসনে একটি পথনকশা করতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা মেনে সংকট নিরসন হবে। 

আরও পড়ুন

নতুন পদ্ধতি কাজে দেবে কি

ডলার-সংকটের মধ্যে আর্থিক হিসাব ও চলতি হিসাবে ঘাটতি হওয়ায় ২০২২ সালের জুলাইয়ে আইএমএফের কাছে ঋণ চায় বাংলাদেশ। ছয় মাস পর সংস্থাটি গত বছরের ৩০ জানুয়ারি ৪৭০ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করে। এর তিন দিনের মাথায় ২ ফেব্রুয়ারি ঋণের প্রথম কিস্তিতে ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ ডলার ও গত ডিসেম্বর মাসে দ্বিতীয় কিস্তিতে ৬৮ কোটি ১০ লাখ ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। ঋণের তৃতীয় কিস্তি বাবদ ১১৫ কোটি ডলার আগামী মাসে আসবে বলে কথা রয়েছে।

আইএমএফের ঋণের শর্ত মেনে গত সপ্তাহে ডলারের মধ্যবর্তী দাম ১১৭ টাকা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক; আগে যা ছিল ১১০ টাকা। ঋণের সুদহারও বাজারভিত্তিক করা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের পরও সংকট কাটবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান অর্থনীতিবিদেরা। 

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রথম আলোকে বলেন, ডলারের দামের যে পদ্ধতি চালু হয়েছে, তাকে ক্রলিং পেগ বলা হলেও তা ক্রল (ওঠানামা) করছে না। এখন কঠিন সময়ে সঠিক নীতিমালা নিয়ে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। ডলারের দাম যেন ধীরে ধীরে বাড়তে ও কমতে পারে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বিমুখী আচরণ করার সুযোগ শেষ হয়ে এসেছে। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদহারও পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার সুযোগ দিতে হবে। তাহলে রিজার্ভের ওপর চাপ কমবে।


Monday, May 13, 2024

নামেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, লেখাপড়া যা–তা ৪২টি মাদ্রাসা থেকে কেউ পাস করেনি। ৯টি বিদ্যালয় থেকে কেউ পাস করেনি। ২,৯৬৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সবাই পাস।


 

দুই বছর আগে ঝড়ে টিনশেড ভবন ভেঙে যায়। এরপর আর ভবন নির্মাণ করা হয়নি। পটুয়াখালীর বাউফলের উত্তর কেশবপুর বালিকা দাখিল মাদ্রাসাটি এখন কেবল কাগজে আছে, বাস্তবে এর কোনো কাঠামো নেই। ১৯৮৮ সালে মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত। তবে এমপিওভুক্ত নয়। এই মাদ্রাসা থেকে এবার একজন দাখিল পরীক্ষা দিলেও পাস করেনি।

মাদ্রাসার শিক্ষক মোছা. লতুফা বেগম বলেন, মাদ্রাসাটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য এ বছর একজনকে দিয়ে পরীক্ষার ফরম পূরণ করিয়েছিলেন।

তবে একই উপজেলার উত্তর দাশপাড়া দাখিল মাদ্রাসাটি এমপিওভুক্ত। কিন্তু এই মাদ্রাসা থেকে ১৪ জন পরীক্ষা দিলেও কেউ পাস করেনি।

শুধু এই দুই মাদ্রাসা নয়, গত রোববার প্রকাশিত এ বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সারা দেশ থেকে বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা মিলিয়ে ৫১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। এর মধ্যে ৪২টি মাদ্রাসা, ৯টি বিদ্যালয়।

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই মফস্‌সলের। আছে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানও।

এ বছরসহ গত কয়েক বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতিবছরই বেশ কিছুসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেউ পাস করতে পারছে না। শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশির ভাগই মাদ্রাসা। এ ছাড়া এ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই মফস্‌সল এলাকার। হাতে গোনা শিক্ষার্থী নিয়ে নামকাওয়াস্তে চলে এসব প্রতিষ্ঠান। সুযোগ-সুবিধাও অপ্রতুল। এগুলোর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকিগুলো এমপিওভুক্ত নয়। তবে কিছু এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকেও শূন্য পাস হচ্ছে।

শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের মূল্যায়ন হলো এসব প্রতিষ্ঠানে ঠিকমতো পড়াশোনা হয় না। তাই এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন আছে কি না, ভাবতে হবে।

আরও পড়ুন

অবশ্য শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিপক্ষে। গত রোববার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আরও বেশি সহযোগিতা করতে হবে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি কাম্য শিক্ষার্থী সংখ্যা ধরে রাখতে না পারে, তবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখা যাবে না।

নামেই বিদ্যালয়

এবার যে নয়টি বিদ্যালয় থেকে এবার একজনও পাস করতে পারেনি, তার মধ্যে তিনটি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন। এগুলোর সবগুলোই মফস্‌সলের। এর মধ্যে সোমজানি উচ্চবিদ্যালয়টি টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় অবস্থিত। এখান থেকে তিনজন পরীক্ষা দিয়ে সবাই ফেল করেছে। ৩০ বছর আগে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হলেও দীর্ঘদিনেও এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষকেরা বিদ্যালয়ে আসেন না।

গতকাল সোমবার বেলা দুইটার দিকে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের টিনের ঘরে তালা। ছাত্র–শিক্ষক কেউ নেই। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আবদুর রাজ্জাক মুঠোফোনে বলেন, বিনা বেতনে শিক্ষকেরা থাকতে চান না।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস হয় না। দু-চারজন শিক্ষার্থী এলেও শিক্ষকেরা আসেন না। স্থানীয় কয়েকজন যুবককে পাঠদানের জন্য নেওয়া হয়েছে।

কোনো প্রতিষ্ঠানে যদি শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে যায়, সে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আরও বেশি সহযোগিতা করতে হবে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি কাম্য শিক্ষার্থী সংখ্যা ধরে রাখতে না পারে, তবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখা যাবে না।
শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী

এ রকম আরেকটি বিদ্যালয় বেগম রূপবান উচ্চবিদ্যালয়। এটি মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় অবস্থিত। এখান থেকে ১০ জন পরীক্ষা দিয়ে সবাই ফেল করেছে। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায় অবস্থিত চরতেরোটেকিয়া মৌজা বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ৯ জন পরীক্ষা দিয়েছিল।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার প্রথম আলোকে বলেন, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। জবাব সন্তোষজনক না হলে পাঠদানের অনুমতি বাতিল করা হবে।

আরও পড়ুন

শূন্য পাস দুটি বিদ্যালয় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের অধীন। এগুলো রাজশাহীর মোহনপুর ও নওগাঁর আত্রাইয়ে অবস্থিত। আর দিনাজপুর বোর্ডের অধীন চারটি শূন্য পাস প্রতিষ্ঠান গাইবান্ধা, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও দিনাজপুরে অবস্থিত।

শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হবে। জবাব সন্তোষজনক না হলে পাঠদানের অনুমতি বাতিল করা হবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার

শূন্য পাস মাদ্রাসা বেশি

যে ৪২টি মাদ্রাসা থেকে কেউ পাস করেনি, সেগুলোর সব কটিই ঢাকার বাইরে অবস্থিত। যেমন ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার বীরকয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে পরীক্ষা দিয়েছিল মাত্র একজন। গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, মাদ্রাসাটির পাকা ভবনের কিছু অংশে টিনের চালা; আর কিছু অংশ ফাঁকা। মাঠে আবর্জনা। শ্রেণিকক্ষে ভাঙা কয়েকটি বেঞ্চ। মূলত প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব ধরে রাখা এবং সম্পদ রক্ষার জন্য কাগজে–কলমে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার চারটি মাদ্রাসা থেকে কেউ পাস করেনি। এগুলোর পরীক্ষার্থী ছিল ৮ থেকে ১৮ জনের মধ্যে।

২০০০ সালে শিক্ষা বোর্ড থেকে মাদ্রাসাটি পাঠদানের অনুমতি পায়। তবে একপর্যায়ে এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীরা অন্যত্র চলে যান। ওই এলাকার বীরকয়া নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফাতুল্যা প্রথম আলোকে বলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানটির নাম ও অস্তিত্ব ধরে রেখেছেন। কিছু গরিব শিক্ষার্থীর যাবতীয় খরচ বহন করে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়। প্রতিষ্ঠানের কিছু সম্পদ রয়েছে। প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে সব বেহাত হবে।

ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার চারটি মাদ্রাসা থেকে কেউ পাস করেনি। এগুলোর পরীক্ষার্থী ছিল ৮ থেকে ১৮ জনের মধ্যে।

যে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কেউ পাস করে না, সেগুলোর শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থী খুবই কম। এর কারণ হলো এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষকস্বল্পতাসহ বিভিন্ন সমস্যা আছে। তাই কয়েক বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করে যদি দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে খারাপ করছে, তাহলে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়াই ভালো হবে
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক

৫০ শতাংশের ওপরে পাসের হার বেশি

ফলাফলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১০৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাসের হার ১০ শতাংশের মধ্যে। ১৪৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১০ শতাংশের ওপর থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত এবং ২০ শতাংশের ওপর থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১ হাজার ৭৯৫টি। ৫০ শতাংশের ওপর থেকে ১০০ শতাংশের নিচে পাস করা প্রতিষ্ঠান ২৪ হাজার ৮০৪টি। আর ২ হাজার ৯৬৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সবাই পাস করেছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক প্রথম আলোকে বলেন, যে প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কেউ পাস করে না, সেগুলোর শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থী খুবই কম। এর কারণ হলো এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষকস্বল্পতাসহ বিভিন্ন সমস্যা আছে। তাই কয়েক বছরের ফলাফল পর্যালোচনা করে যদি দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানগুলো ধারাবাহিকভাবে খারাপ করছে, তাহলে সেগুলো বন্ধ করে দেওয়াই ভালো হবে বলে মনে করেন তিনি।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কামনাশীষ শেখর, টাঙ্গাইল, মামুনুর রশীদ, বাগমারা এ বি এম মিজানুর রহমান, বাউফল]