Tuesday, July 9, 2024

চাকরির প্রশ্নপত্র ফাঁসে তাঁরা জড়িত, জানত পিএসসি

 

রেলওয়ের একটি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গত সোমবার গ্রেপ্তার হওয়া ১৭ জনের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) কর্মকর্তা-কর্মচারী ছয়জন। এর মধ্যে পাঁচজন এখনো কর্মরত। আরেকজনকে ১০ বছর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।

যে পাঁচজন এখন কর্মরত রয়েছেন, তাঁদের সবার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল। এর মধ্যে তিনজনের ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতাও পেয়েছিল পিএসসি। যে কারণে একজনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। একজনকে ঢাকার প্রধান কার্যালয় থেকে সিলেটে বদলি করা হয়। আরেকজনকে বরখাস্ত করা হলেও আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি দায়িত্ব ফিরে পান।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া সাংবিধানিক সংস্থা পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে রয়েছেন উপপরিচালক মো. আবু জাফর ও জাহাঙ্গীর আলম। আরও আছেন সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর কবির, কর্মচারী (ডেসপাচ রাইডার) মো. খলিলুর রহমান ও অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম। এ ছাড়া রয়েছেন পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলী।

আরও পড়ুন
প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িতদের মধ্যে পিএসসির বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ছয়জন।

এই ছয়জনের মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত থাকার বিষয়টি পিএসসির নিজস্ব তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৪ সালে চাকরিচ্যুত হন সৈয়দ আবেদ আলী। বরখাস্ত হয়েছিলেন খলিলুর রহমান। বদলি করা হয়েছিল জাহাঙ্গীর আলমকে। আর পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হয়নি আবু জাফরকে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পিএসসির যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম এসেছে, দেখা যাচ্ছে তাঁরা আগেও এ ধরনের গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বিভিন্ন সময় পিএসসির নিজস্ব অনুসন্ধান ও তদন্তেই তা বেরিয়ে এসেছে। পিএসসির ভেতরেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের একটি চক্র কাজ করছে। এর মধ্যে কেউ ধরা পড়েছেন, কেউ এখনো আড়ালে রয়ে গেছেন। বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক সংস্থা পিএসসি কেন ফৌজদারি মামলা করেনি, সেই প্রশ্নও তুলেছেন জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় অপরাধ স্বীকার করে গতকাল মঙ্গলবার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন ছয়জন। এর মধ্যে পিএসসির সাবেক ও বর্তমান কর্মচারীই তিনজন। তাঁরা হলেন সৈয়দ আবেদ আলী, খলিলুর রহমান ও সাজেদুল ইসলাম।

আরও পড়ুন

গ্রেপ্তার হওয়া ১৭ জনের বিষয়ে আদালতে জমা দেওয়া সিআইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামিরা ৫ জুলাই পিএসসির অধীনে নেওয়া বাংলাদেশ রেলওয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী (নন–ক্যাডার) পদের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করেন। নিয়োগ প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন এবং প্রশ্নের উত্তর বিতরণ করেছেন তাঁরা। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা স্বীকার করেছেন, বিগত বছরগুলোতেও বিভিন্ন সময়ে বিসিএসসহ পিএসসির বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে তাঁরা জড়িত ছিলেন।

সিআইডি বলছে, ৫ জুলাইয়ের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় অন্তত ৫০ জন জড়িত। এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হওয়া ১৭ জনকে গতকাল কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

আরও পড়ুন

পিএসসির ভেতরে প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্র

পিএসসির উপপরিচালক আবু জাফর এর আগেও বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে সাংবিধানিক এই সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা গতকাল প্রথম আলোকে জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, একটি গোয়েন্দা সংস্থা থেকে পিএসসির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে তাঁর অপরাধে জড়িত থাকার বিষয়টি বেশ কয়েক বছর আগেই জানানো হয়েছিল। এ কারণে তাঁকে কয়েকবার পদোন্নতি দেওয়া হয়নি।

জাফর ঢাকার মালিবাগে একটি কোচিং সেন্টার চালান। এর নাম জ্যোতি কোচিং সেন্টার। এই কোচিং সেন্টারের আড়ালে প্রশ্নপত্র কেনাবেচার কাজ চলে বলে পিএসসির একাধিক সূত্র বলছে।

আরেক উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলমও প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত, এটি পিএসসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অবগত বলে জানা গেছে। যে কারণে গত ২ জানুয়ারি তাঁকে পিএসসি সচিবালয়ের (ঢাকার আগারগাঁওয়ে) প্রশাসন শাখা থেকে বদলি করে সিলেট আঞ্চলিক কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

পিএসসির সহকারী পরিচালক মো. আলমগীর কবিরের বিরুদ্ধেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ রয়েছে। মিরপুরে তাঁর একটি কোচিং সেন্টার রয়েছে।

আরও পড়ুন

পিএসসির ডেসপাচ (চিঠিপত্র আদান-প্রদান) শাখার কর্মচারী খলিলুর রহমান ৩৩তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্নপত্র বিক্রি করেন। প্রশ্নপত্র বিক্রির সময় ২০১২ সালে হাতেনাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল র‌্যাব। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে তখন শাহবাগ থানায় মামলা হয়েছিল। ২০১২ সালের ৭ অক্টোবর তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার তদন্ত করেন পিএসসির উপপরিচালক এস এম গিয়াস উদ্দীন। তদন্ত শেষে তিনি যে প্রতিবেদন জমা দেন, তাতে বলা হয় খলিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। পরে তাঁকে বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তখন তাঁর বিরুদ্ধে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে নেয় পিএসসি।

পিএসসির একজন কর্মকর্তা বলেন, খলিলুর রহমান চাকরিতে ফিরে এলেও তাঁকে ভালো কোনো পদে দেওয়া হয়নি।

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া পিএসসির সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীর বিরুদ্ধে প্রথমে মামলা হয়েছিল ২০১৪ সালে। ওই বছরের ২২ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ‘সহকারী মেইনটেন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার’ পদে নিয়োগের লিখিত পরীক্ষায় এক পরীক্ষার্থীকে বাইরে থেকে চারটি লিখিত উত্তরপত্র সরবরাহ করার অভিযোগ উঠেছিল। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পায় পিএসসি। একই বছর তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। পরে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

পিএসসির তদন্তে উঠে এসেছে, সৈয়দ আবেদ আলী ভুয়া স্থায়ী ঠিকানা ব্যবহার করে পাসপোর্ট এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সও নিয়েছেন। তদন্ত চলাকালে তিনি মাহতাব উদ্দিন নামের এক ব্যক্তিকে নিজের পিতা হিসেবে উল্লেখ করেন। যদিও তাঁর পিতার নাম আবদুর রহমান।

আরও পড়ুন

উপপরিচালককে দিয়েছিলেন ২ কোটি টাকা

প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম জিজ্ঞাসাবাদে সিআইডির কর্মকর্তাদের বলেছেন, রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তিনি সংগ্রহ করেছেন উপপরিচালক মো. আবু জাফরের কাছ থেকে। এ জন্য আবু জাফরকে তিনি ২ কোটি টাকা দেন। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আরও বলেছেন, পিএসসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কক্ষের ট্রাংক খুলে তিনি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে সেগুলো টাকার বিনিময়ে ফাঁস করতেন। এর মধ্যে বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার (কোন বিসিএসের, সেটি জানা যায়নি) প্রশ্নপত্রও রয়েছে। এ কাজে পিএসসির সাবেক গাড়িচালক আবেদ আলী বিভিন্ন সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বলে জানান সাজেদুল।

এদিকে রেলওয়ের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় পিএসসির চেয়ারম্যান সোহরাব হোসাইন গতকাল নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তদন্তে পিএসসির একজন যুগ্ম সচিবকে আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পিএসসির চেয়ারম্যান বলেন, ‘যদি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে থাকে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি আমারও যদি কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকে, তাহলে আমিও শাস্তির বাইরে যাব না।’

আরও পড়ুন

জাহাঙ্গীরের আছে ফ্ল্যাট ও গাড়ি

প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত পিএসসির উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম পরিবার নিয়ে থাকতেন ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ডি ব্লকের ১ নম্বর সড়কের ৮/ও নম্বর ভবনের তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে। গতকাল বিকেলে ওই বাড়িতে গিয়ে কথা হয় নিরাপত্তাকর্মী বাহারুল হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, গত শুক্রবার পুলিশ বাসায় এসে জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়ে যায়। পরদিন জাহাঙ্গীর স্ত্রী ও দুই সন্তান বাসা থেকে বের হয়ে যান। ওই ফ্ল্যাট এখন তালাবদ্ধ।

ভবনের তত্ত্বাবধায়ক জিয়াউল ইসলাম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, জাহাঙ্গীর আলম যে ফ্ল্যাটে থাকতেন, সেটি তিনি কিনেছেন। ২০১৯ সালের দিকে তিনি ওই ফ্ল্যাটে ওঠেন। তাঁর একটি গাড়ি রয়েছে।

জাহাঙ্গীরসহ প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া পিএসসির পাঁচজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বিষয়টি গতকাল এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানিয়েছে পিএসসসি।

আরও পড়ুন

সরকারি চাকরির বিধিবিধান বিশেষজ্ঞ ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ আসার পর পিএসসি নিজে মামলা করতে পারত, বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) পাঠাতে পারত; কিন্তু পিএসসসি সেটি করেনি।

ফিরোজ মিয়া মনে করেন, পিএসসির ভেতর থেকে কারও সহযোগিতা ছাড়া ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে পারার কথা নয়। হয়তো ওপরের কারও সরলতা বা দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁরা এ অপরাধ করেছেন। এখন পিএসসির উচিত হবে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা। এ জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেও

Sunday, July 7, 2024

কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীদের ‘বাংলা ব্লকেড’ আজও, ফার্মগেট পেরোনোর ঘোষণা


 সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিল করে জারি করা পরিপত্র পুনর্বহালসহ চার দফা দাবিতে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’–এর ব্যানারে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেন। গতকাল বিকেলে রাজধানীর শাহবাগ এলাকায়ছবি: সাজিদ হোসেন

সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা বাতিলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের অবরোধ কর্মসূচি ‘বাংলা ব্লকেডে’র কারণে গতকাল স্থবির হয়ে পড়ে রাজধানী শহর। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। আজ সোমবারও শিক্ষার্থীদের এ কর্মসূচি চলবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

গতকাল রোববারের বাংলা ব্লকেডে কার্যত অচল হয়ে পড়ে ঢাকার বড় অংশ। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে শাহবাগ থেকে আন্দোলনকারীরা ঘোষণা দেন, দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে অনির্দিষ্টকালের জন্য তাঁরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে ছাত্র ধর্মঘট কর্মসূচি অব্যাহত রাখবেন।

শাহবাগ মোড় দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। একে একে বিভিন্ন এলাকায় অবরোধের ফলে রাজধানীর বড় অংশ তীব্র যানজটের কবলে পড়ে।

ছাত্র ধর্মঘটের পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবরোধ কর্মসূচি চলবে। আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এই কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আজ (রোববার) আমরা শাহবাগ থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত গিয়েছি। কাল ফার্মগেট পার হয়ে যাব।’ আজ বেলা সাড়ে তিনটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সামনে শিক্ষার্থীদের জমায়েত হবে জানিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘কোনো আবাসিক হলে বাধা দেওয়া হলে আমাদের জানাবেন। আমরা সম্মিলিতভাবে সেই হল ঘেরাও করব।’

পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল শুধু ঢাকাতেই আটটি স্থানে সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। কেন্দ্রীয়ভাবে শাহবাগ মোড় অবরোধ করা হয়। এখান থেকে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ গিয়ে পাশের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের মোড় দখল করে কারওয়ান বাজারের কাছাকাছি আসে। এ ছাড়া সায়েন্স ল্যাবরেটরি, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, চানখাঁরপুল ও আগারগাঁওয়েও সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা।

বাংলা ব্লকেড কর্মসূচির অংশ হিসেবে বেলা আড়াইটার পর শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হতে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হল ও বিভাগের ব্যানারে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা আসতে থাকেন। বেলা সোয়া তিনটার মধ্যে গ্রন্থাগারের সামনে দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থী জড়ো হন। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে শুরু হয় মিছিল-স্লোগান। পরে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে বিকেল চারটার দিকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করেন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। এ সময় শাহবাগ মোড় দিয়ে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। একে একে বিভিন্ন এলাকায় অবরোধের ফলে রাজধানীর বড় অংশ তীব্র যানজটের কবলে পড়ে।

একদল আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী বিকেলে রাজধানীর চানখাঁরপুল মোড় অবরোধ করেন। এতে ওই সড়ক দিয়েও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের ওপরও।

বিভিন্ন সড়ক অবরোধ

কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকা অবরোধ করেছেন। গতকাল রোববার দুপুরে
কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা ঢাকার সায়েন্স ল্যাব এলাকা অবরোধ করেছেন। গতকাল রোববার দুপুরে
ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষার্থীরা ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’, ‘একাত্তরের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’ প্রভৃতি স্লোগান দেন। ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের মোড়ে বিকেল পাঁচটার দিকে বিদেশি অতিথিবাহী মাইক্রোবাস আটকে দেন শিক্ষার্থীরা। ‘গো ব্যাক, গো ব্যাক’ স্লোগানে গাড়িটি পিছু হটে।

একদল আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী বিকেলে রাজধানীর চানখাঁরপুল মোড় অবরোধ করেন। এতে ওই সড়ক দিয়েও যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের ওপরও। সেখানেও তীব্র যানজট তৈরি হয়। বেলা পৌনে দুইটা থেকে রাজধানীতে যান চলাচলের আরেক গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন ঢাকা কলেজের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তবে দুপুর ১২টা থেকেই তাঁরা সেখানে জড়ো হতে থাকেন। সন্ধ্যা সাতটার দিকে অবরোধ তুলে নিয়ে তাঁরা কলেজে ফিরে যান। ইডেন মহিলা কলেজের ছাত্রীরা রাজধানীর নীলক্ষেত মোড় অবরোধ করেন। আগারগাঁওয়ে সড়ক অবরোধ করেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

আমাদের আন্দোলন বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে কর্মসূচি পালন করেছেন। আমাদের আদালত দেখিয়ে লাভ নেই, আমরা আপনাদের সংবিধান দেখাচ্ছি। আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী এবারও শিক্ষার্থীদের মতের পক্ষে সংসদে দাঁড়িয়ে কোটার বিষয়ে চূড়ান্ত সুরাহা দেবেন।
আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম

কোটাব্যবস্থা বাতিল করে ২০১৮ সালে সরকারের জারি করা পরিপত্র পুনর্বহালসহ চার দফা দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা সোয়া চার ঘণ্টা পর রাজধানীর শাহবাগ মোড় ছাড়েন। রাত আটটার দিকে অবরোধ তুলে নেন তাঁরা। তখন যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। প্রতিটি অবরোধের স্থানেই পুলিশের বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন ছিল।

শাহবাগ মোড়ের অবরোধ তুলে নেওয়ার আগে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। বক্তব্য দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা সারজিস আলম ও হাসনাত আবদুল্লাহ। সন্ধ্যার দিকে এই তিন নেতাসহ আরেক নেতা আসিফ মাহমুদকে পুলিশ ডেকে নিয়ে কথা বলে। ফিরে এসে তাঁরা সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা কোনো আপসে যাবেন না।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের আন্দোলন বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমে কর্মসূচি পালন করেছেন। আমাদের আদালত দেখিয়ে লাভ নেই, আমরা আপনাদের সংবিধান দেখাচ্ছি। আমরা আশা করি, প্রধানমন্ত্রী এবারও শিক্ষার্থীদের মতের পক্ষে সংসদে দাঁড়িয়ে কোটার বিষয়ে চূড়ান্ত সুরাহা দেবেন।’

শিক্ষার্থীদের দাবি

সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা গতকাল রোববার শাহবাগসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় সড়ক অবরোধ করায় তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কারওয়ানবাজার এলাকার চিত্র
সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা গতকাল রোববার শাহবাগসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকায় সড়ক অবরোধ করায় তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কারওয়ানবাজার এলাকার চিত্র
ছবি: জাহিদুল করিম

কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলছেন, কোটাব্যবস্থা নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে চাইলে আগের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করতে হবে। এই কমিশনের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাদ দিতে হবে। অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য যৌক্তিক ও ন্যূনতম কোটা রাখা যেতে পারে। তবে কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাতালিকা থেকে নিয়োগ দিয়ে শূন্য পদগুলো পূরণ করতে হবে। চাকরিতে একই কোটা একাধিকবার ব্যবহার করা যাবে না। দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

জাহাঙ্গীরনগরে অবরোধ-বিক্ষোভ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গতকাল বেলা ১১টা ১০ মিনিট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসংলগ্ন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে অবরোধ শুরু করেন। এ সময় সড়কের দুই পাশে যানজটের সৃষ্টি হয়। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন আন্দোলনকারীরা। মিছিলটি কয়েকটি সড়ক ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে গিয়ে শেষ হয়।

চট্টগ্রামে বাধা

চার দফা দাবিতে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি পালন করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিকেল চারটায় নগরের ষোলশহর রেলস্টেশন থেকে মিছিলের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির শুরু হয়। তবে পুলিশের বাধার মুখে মিছিলের গন্তব্য পরিবর্তন করেন শিক্ষার্থীরা।

নগরের বহদ্দারহাটের উড়ালসড়কের র‌্যাম্প অভিমুখে মিছিল নিয়ে রওনা হন শিক্ষার্থীরা। তবে স্টেশন এলাকার মূল ফটকে আসতেই পুলিশের বাধার মুখে পড়েন তাঁরা। এ সময় পুলিশের কয়েকজন সদস্য শিক্ষার্থীদের বাধা দিয়ে গন্তব্য সম্পর্কে জানতে চান। পরে শিক্ষার্থীরা তাঁদের গন্তব্য নগরের মুরাদপুর হয়ে বহদ্দারহাটের উড়ালসড়কের সামনে পর্যন্ত জানালে পুলিশ তাঁদের আটকে দেয়। এ সময় শিক্ষার্থীরা পুলিশের উদ্দেশে ‘ভুয়া’ স্লোগান দেন। কিছুক্ষণ পুলিশের সঙ্গে তর্কাতর্কির পর শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে ২ নম্বর গেট এলাকায় আসেন। শিক্ষার্থীরা সেখানে কোটাবিরোধী বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে অবস্থান করেন। প্রায় এক ঘণ্টা অবস্থান নিয়ে তাঁরা কোটাবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেন। এ সময় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

কোটাপদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে পথনাটক, কবিতা, গান পরিবেশন করে ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ জানিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম ও বাস চলাচল বন্ধের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন রেললাইন অবরোধ করা হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্যুঞ্জয়ী মুজিব ম্যুরালের সামনে প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন এবং জাতীয় পতাকা নিয়ে জড়ো হন শতাধিক শিক্ষার্থী। পরে তাঁরা মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে প্রধান ফটক হয়ে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। অবরোধ চলাকালে সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও খড়কুটায় আগুন জ্বালিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। দুই ঘণ্টা অবরোধ শেষে বেলা দেড়টার পর শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের ভেতর চলে যান।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

বেলা ১১টায় শিক্ষার্থীরা বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে জড়ো হয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেন। বৃষ্টির মধ্যে দুপুর ১২টা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কের গড়িয়ার পাড় থেকে রূপাতলী পর্যন্ত তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। একই দাবিতে বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের শিক্ষার্থীরাও বেলা ১১টা থেকে বরিশালের নথুল্লাবাদ এলাকায় মহাসড়ক অবরোধ করেন।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

বিকেল চারটায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে এসে চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার কোটবাড়ি অংশে অবস্থান নেন। ৪৫ মিনিট ধরে অবরোধের ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ি থেকে দুই দিকে অন্তত ১৫ কিলোমিটারে যানজট সৃষ্টি হয়।

হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়

সকাল ১০টা থেকে দিনাজপুরের হাজী মুহ্ম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকে জড়ো হতে থাকেন। পরে বেলা ১১টায় দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাঁদের অবরোধ প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন। আধা ঘণ্টা পর শিক্ষার্থীরা সড়ক থেকে সরে যান। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কয়েকটি সড়কে তাঁরা বিক্ষোভ মিছিল করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা পৌনে সাতটা পর্যন্ত ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাথালিয়ায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ সময় মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহন আটকা পড়ে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা

Wednesday, July 3, 2024

জামালপুরে যমুনার পানি বেড়ে ১৪ ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

 

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে জামালপুরে যমুনা নদীর পানি বেড়ে ৩টি উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকাল নয়টার দিকে যমুনা নদীর বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে ৬১ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। লোকালয়ে পানি ঢুকে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে নদীতীরবর্তী ও দুর্গম চরাঞ্চলের কয়েক হাজার বাসিন্দা।

এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জামালপুর কার্যালয়ের পানি পরিমাপক আবদুল মান্নান। তিনি বলেন, যমুনার পানি দ্রুতগতিতে বাড়ছে। যেভাবে পানি বাড়ছে, এতে নতুন নতুন আরও এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা আছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা আছে।

অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গতকাল বুধবার রাত থেকে পানি হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ঘরবাড়ির পাশাপাশি তলিয়ে যাচ্ছে নিম্নাঞ্চলের ফসলি জমি।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইসলামপুর উপজেলার চিনাডুলী, নোয়ারপাড়া, কুলকান্দি, পাথর্শী, সাপধরী, বেলগাছা; দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চিকাজানী, চুকাইবাড়ী ও বাহাদুরাবাদ; মেলান্দহ উপজেলার ঘোষেরপাড়া, আদ্রা, মাহমুদপুর, নাংলা ও কুলিয়া ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল ইতিমধ্যেই প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইসলামপুর-গুঠাইল সড়কের দেলিরপাড় এলাকার ড্রাইবেশন ডুবে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া পানির তোড়ে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার দেওয়ানগঞ্জ-খোলাবাড়ী সড়ক ভেঙে যোগাযোগ বন্ধ আছে।

এসব এলাকায় এখনই খাদ্যসহায়তার প্রয়োজন। এমনিতেই এসব অঞ্চলের মানুষ হতদরিদ্র। তাঁদের দিন এনে দিন খাওয়ার মতো অবস্থা। পানিতে সবকিছুই তলিয়ে যাচ্ছে। তাঁরা বেকার হয়ে পড়েছেন। এর ফলে দ্রুত তাঁদের ত্রাণসহায়তার প্রয়োজন।
চিনাডুলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল ছালাম

চিনাডুলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল ছালাম বলেন, ইউনিয়নটির বেশির ভাগ এলাকায় পানি ঢুকেছে। এর ফলে নদীতীরবর্তী অনেক বাসিন্দা এখন পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এসব এলাকায় এখনই খাদ্যসহায়তার প্রয়োজন। এমনিতেই এসব অঞ্চলের মানুষ হতদরিদ্র। তাঁদের দিন এনে দিন খাওয়ার মতো অবস্থা। পানিতে সবকিছুই তলিয়ে যাচ্ছে। তাঁরা বেকার হয়ে পড়েছেন। এর ফলে দ্রুত তাঁদের ত্রাণসহায়তার প্রয়োজন।

জামালপুরের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন। তিনি বলেন, পানি বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিদের কাছে নদীতীরবর্তী অঞ্চলগুলোর তথ্য চাওয়া হয়েছে।


আবার শতক ছাড়াল পেঁয়াজের কেজি

 

আবার ১০০ টাকা ছাড়িয়েছে পেঁয়াজের কেজি। রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে গতকাল বুধবার দেশি পেঁয়াজ ১০০-১১০ টাকা কেজি বিক্রি হতে দেখা গেছে। বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে দেশি পেঁয়াজের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ভারত থেকে কম আমদানি হওয়ার কারণে পেঁয়াজের দাম বাড়ছে।

দেশে এমন সময়ে পেঁয়াজের দাম শতক ছাড়াল, যখন বাজারে অন্যান্য নিত্যপণ্যের দামও বাড়তি। যেমন বাজারে কাঁচা মরিচের কেজি এখন আড়াই শ টাকার ওপরে। আর ব্রয়লার মুরগির বাদামি ডিম প্রতি ডজন ১৫০-১৬০ টাকা। এ ছাড়া গত কয়েক দিনের বৃষ্টির মধ্যে দাম বেড়েছে বেশ কিছু সবজিরও।

মূলত নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের কারণে ১৪ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেশি ভোগাচ্ছে মানুষকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, সর্বশেষ গত মে মাসে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ; যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

২ সপ্তাহে বেড়েছে ২০ টাকা

গতকাল রাজধানীর শেওড়াপাড়া, তালতলা ও কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দুই সপ্তাহ আগের তুলনায় দেশি পেঁয়াজের দাম অনেকটা বেড়েছে। পেঁয়াজের খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, চলতি বছর পেঁয়াজের মৌসুম শুরুই হয়েছে উচ্চ দাম দিয়ে। ফেব্রুয়ারি মাসে মৌসুমের শুরুতে ঢাকায় নতুন পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮০-১০০ টাকা দরে। মার্চে পেঁয়াজের দাম ১২০ টাকা ছাড়িয়েছিল। এরপর এপ্রিলে কিছুটা কমে আবার তা বাড়তে থাকে। কোরবানি ঈদের সময় বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি ছিল ৮০-৯০ টাকা; যা এখন ১০০-১১০ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ ১৫ দিনের ব্যবধানে পেঁয়াজ কেজিতে ২০ টাকা বেড়েছে। শুধু গত তিন দিনেই বেড়েছে ১০ টাকা।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারত থেকে চার-পাঁচ মাস পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ ছিল। ফলে এ সময় মানুষ বেশি পরিমাণে দেশি পেঁয়াজ কিনেছেন। অন্যদিকে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানির অনুমতি দিলেও ৪০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। দেশটির অভ্যন্তরেও পেঁয়াজের দাম বাড়তি। ফলে বাজারে আমদানি করা পেঁয়াজের দাম দেশি পেঁয়াজের চেয়েও বেশি পড়ছে। রাজধানীর শ্যামবাজারের পাইকারি পেঁয়াজ ব্যবসায়ী আবদুল মাজেদ প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে ভারত থেকে কম পরিমাণে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে।

গড় দাম ৮০ টাকার বেশি

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের হিসাবে, সাধারণত মৌসুমের সময় দেশি পেঁয়াজের দাম ৪০ টাকার নিচে থাকে। তবে এবার পেঁয়াজের দর বেশ চড়া ছিল। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, এপ্রিলে ভরা মৌসুমের সময়ও ৪৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সাজিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘৪০ টাকা কেজির পেঁয়াজ এখন দ্বিগুণের বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। এভাবে লাফিয়ে দাম বাড়ার কারণে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি।’

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, দেশে পেঁয়াজের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩০ লাখ টন। এর এক-তৃতীয়াংশ আমদানি করে মেটাতে হয়। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ টন। তার আগের বছর দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ছিল ৩৬ লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদার চেয়েও দেশে এখন বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হচ্ছে। এ হিসাবে বাজারে পেঁয়াজের ঘাটতি হওয়ার কথা নয়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, বাজারে কোনো কারণে সরবরাহ কমলে পণ্যের দাম বাড়তে পারে। তবে মূল সমস্যা মূল্যস্ফীতি। কারণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে; কিন্তু আয় বাড়েনি। ফলে বাড়তি দামে পণ্য কিনতে সাধারণ মানুষ হিমশিম খাচ্ছে। এ জন্য মূল্যস্ফীতি কমানো ও মানুষের আয়-রোজগার বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।