Monday, April 22, 2024

সওজের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মনির হোসেন কারাগারে


 

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের পৃথক তিনটি মামলায় সড়ক ও জনপথের (সওজ) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠানকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন আজ সোমবার এ আদেশ দেন।

প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান সরকারি কৌঁসুলি মীর আহমেদ আলী সালাম। তিনি বলেন, ৫ কোটি ৫৮ লাখ ৫৮ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মনির হোসেনের বিরুদ্ধে গত ৩ জানুয়ারি মামলা করে দুদক। ওই মামলায় তিনি আজ আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে জামিন আবেদন নাকচ করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।

মীর আহমেদ আলী সালাম আরও বলেন, এসব মামলায় মনির হোসেনের স্ত্রী জেসমিন, ছেলে ও মেয়েকে আসামি করা হয়েছে। তাঁরা জামিনে আছেন।

এ কে এম মনির হোসেন ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে ওই বছরের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সওজের প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে পুরকৌশলে প্রথম বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর ১৯৮৯ সালে সওজের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন তিনি।


বিএনপির ১৮ নেতাসহ ৩৮ জন উপজেলা নির্বাচনে


 

বিএনপি উপজেলা পরিষদের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেও দলটির অন্তত ৩৮ জন সাবেক-বর্তমান নেতা এবং তাঁদের স্বজন চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করছেন। প্রথম দফার নির্বাচনে তাঁরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি।

দলটির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এই ৩৮ জনের মধ্যে ১৮ জন বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের পদধারী নেতা। বাকি ২০ জনের মধ্যে ১১ জন দল থেকে বিভিন্ন সময়ে বহিষ্কৃত, অব্যাহতিপ্রাপ্ত এবং বিএনপির সাবেক নেতা ও অঙ্গসংগঠনের নেতা রয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপির নেতাদের আত্মীয়স্বজন বা এই দলের লোক হিসেবে পরিচিত আরও ৯ জন নির্বাচনে রয়েছেন।

আগামী ৮ মে প্রথম ধাপে সারা দেশের ১৫০টি উপজেলায় ভোট হবে। বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এই ধাপে দলের সাবেক-বর্তমান মিলে ৪৯ নেতা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। গতকাল সোমবার ছিল মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। এর মধ্যে ১১ জন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন। অনেকে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন না করার ঘোষণা দেন।

আরও পড়ুন

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ১৫ এপ্রিল বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপজেলা নির্বাচন না করার সিদ্ধান্তের পর দলটির নেতৃত্বের চেষ্টা ছিল দলীয় প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে ফেরানোর। এ লক্ষ্যে দলের কেন্দ্রীয়, বিভাগীয় ও জেলার নেতাদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত এবং নেতাদের সব চেষ্টা-তদবির উপেক্ষা করে ৩৮ জন নির্বাচন করছেন। এর মধ্যে দলের থানা-উপজেলা কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ১৮ জন বিভিন্ন পর্যায়ের পদধারী নেতা রয়েছেন।

আগামী ২১ মে দ্বিতীয় ধাপে সারা দেশে ১৬০ উপজেলায় নির্বাচন হবে। প্রথম আলোর প্রতিনিধিদের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ধাপেও বিএনপির অন্তত ৩৫ নেতা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় বিএনপির আইনবিষয়ক সম্পাদক মাসুদুল আলম, পঞ্চগড় সদরে জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক আবু দাউদ প্রধান, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার সদস্য মো. শাহজাহান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে উপজেলা সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লস্কর ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন নির্বাচন না করার ঘোষণা দিয়েছেন।

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার সময় কেঁদে ফেলেন আনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমার ব্যাপক জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও দলের বৃহত্তর স্বার্থে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করছি। আপনারা এই সরকারের অধীন অনুষ্ঠেয় সব নির্বাচন বর্জন করুন, কেউ ভোটকেন্দ্রে যাবেন না।’

আরও পড়ুন

যাঁরা নির্বাচন করছেন

আনোয়ার হোসেন ও নুরুজ্জামান লস্কর চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিলেও সরাইল উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হিসেবে আছেন উপজেলা যুবদলের সাবেক সহসভাপতি হানিফ আহমেদ এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে জেলা জিয়া পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শামীমা আক্তার। দুজনই নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন।

হানিফ আহমেদ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমি এখন দলীয় কোনো পদে নেই। তাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করব। নির্বাচনী প্রচারণায় বেশ সাড়া পাচ্ছি।’

আর শামীমা আক্তার গতকাল বলেন, ‘কুমিল্লার বিভাগীয় নেতারা আমাকে ফোন দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বলেছেন। আমি তাঁদের বলেছি, নির্বাচন চালিয়ে যাব। এর আগে আমি দুটি নির্বাচন করে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছি। এবার জয়ী হব।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যাঁরা নির্বাচন করছেন, তাঁদের মধ্যে আরও আছেন ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলায় বিএনপির সাবেক সহসভাপতি শামসুর রশিদ, ফুলপুর পৌরসভার সাবেক সাধারণ সম্পাদক এমরান হাসান, হালুয়াঘাটে ময়মনসিংহ উত্তর জেলার সদস‌্য আবদুল হা‌মিদ, পিরোজপুরের ইন্দুরকানি উপজেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফায়জুল কবির তালুকদার, ফরিদপুর সদরের সাবেক সভাপতি রউফ উন নবী ও যুবদলের সাবেক নেতা কে এম নাজমুল ইসলাম, সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার সভাপতি নগেন্দ্র চন্দ্র সরকার, নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন, রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান খান, শেরপুরের ঝিনাইগাতীর সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আমিনুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জে জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নাজমুল আলম, কুমিল্লার মেঘনা উপজেলার আহ্বায়ক রমিজ উদ্দিন, নাঙ্গলকোট উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি মাজহারুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরের সাবেক নেতা আশরাফ হোসেন ও ভোলাহাটের আহ্বায়ক বাবর আলী বিশ্বাস, সিলেটের বিশ্বনাথের সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ সুহেল আহমদ চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক গৌছ খান, যুক্তরাজ্য বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. সেবুল মিয়া, যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতা সফিক উদ্দিন, দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার সহসভাপতি সারওয়ার হোসেন, নাটোরের নলডাঙ্গার সাবেক সদস্য সরদার আফজাল হোসেন, নাটোর সদরে জেলার সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গোলাম সারোয়ার, ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে উপজেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফারুক হোসেন মৃধা, নওগাঁর, ধামইরহাটে আয়েন উদ্দিন, মহাদেবপুরে দলের সহসভাপতি আবদুস সাত্তার, সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন নির্বাচন করছেন।

আরও পড়ুন

বিএনপির সূত্র জানিয়েছে, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে যাঁরা নির্বাচনে থাকছেন, শিগগিরই তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় গত রোববার পটুয়াখালী ও কক্সবাজারের দুই নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এটি উপজেলা নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হওয়া নেতাদের প্রতি একটি বার্তা বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এ বিষয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেউ যদি দলের সিদ্ধান্ত না মানে, বুঝতে হবে সরকারি দলের কোনো টোপে পড়েছে। দেশের মানুষ শেখ হাসিনার অধীন কোনো নির্বাচনকে মূল্য দেয় না। কারণ, এখানে ভোটের আগে ভোট হয়ে যায়। এরপরও টোপে পড়ে দলের নীতি-আদর্শের বিরুদ্ধে অবস্থান নিশ্চয়ই অশুভ চক্রের সঙ্গে আঁতাত।’

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা]

Monday, April 15, 2024

ফেসবুকে ২১১ নারীর সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার


 ভুয়া মেজর পরিচয়ে ফেসবুকে আইডি খুলে ২১১ নারীর সঙ্গে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মো. সোহাইল (২৭) নামের একজনকে গ্রেপ্তার করেছে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। গতকাল রোববার শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানা এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এপিবিএন-১২ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সেনাবাহিনীর মেজর, পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা পরিচয়ে ফেসবুকে আইডি খুলে মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতেন। তিনি মূলত মেয়েদের সঙ্গে আপত্তিকর কথা বলে রেকর্ড করে রাখতেন। পরে সেই কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে টাকা নিতেন।

এপিবিএন সূত্র আরও জানায়, কোনো মেয়ের সঙ্গে কথা বলার সময় কেউ সন্দেহ করলে তাঁকে ব্লক করে দিতেন সোহাইল। গ্রেপ্তার সোহাইল ভোলার দৌলতখান উপজেলার বাসিন্দা। তিনি একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। গ্রেপ্তারকালে তাঁর কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন কোম্পানির ১২টি সিম কার্ড, চারটি মুঠোফোন জব্দ করা হয়। সেই সব মুঠোফোনে অসংখ্য নারীর ছবি, আপত্তিকর ভিডিও ও স্ক্রিনশট রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে উত্তরা পূর্ব থানায় একটি মামলা করা হয়েছে।

Sunday, April 14, 2024

১ কোটি ২৮ লাখ টাকা তুলে নিলেন বাসার তত্ত্বাবধায়ক, জানা গেল ব্যাংকের হিসাব বিবরণী পাওয়ার পর

 


ঢাকার উত্তরায় একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার ব্যাংক হিসাব থেকে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা তুলে পালিয়েছেন বাসার তত্ত্বাবধায়ক (কেয়ারটেকার)। নাজমুল হাসান নামের ওই তত্ত্বাবধায়ককে খুঁজছে পুলিশ। মালিকের বিশ্বস্ততা অর্জনের মাধ্যমে ছয় মাসে তিনি এসব টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে মামলার তথ্য ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।

ভুক্তভোগী ওই অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার নাম মাসুদ হাসান। ৮৫ বছর বয়সী মাসুদ হাসানের সন্তানেরা সবাই থাকেন বিদেশে। বৃদ্ধ স্ত্রীকে নিয়ে তিনি রাজধানীর উত্তরায় নিজের বাসায় বসবাস করেন। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মাসুদ হাসান নানা রোগে আক্রান্ত।

এ ঘটনায় মাসুদ হাসানের ছোট ভাই রেজাউল হাসান বাদী হয়ে ৭ এপ্রিল নাজমুলের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা করেছেন। রেজাউল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের অগোচরে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা তুলে আত্মসাৎ করেছে নাজমুল।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নুরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, মাসুদ হাসান এবং তাঁর স্ত্রী দুজনই অসুস্থ। দীর্ঘদিন মাসুদ হাসানের বাসায় কাজকর্ম করে নাজমুল তাঁদের বিশ্বাস অর্জন করেন। মাঝেমধ্যে চেকের মাধ্যমে নাজমুলকে দিয়ে ব্যাংক টাকা তুলিয়ে আনতেন গৃহকর্তা মাসুদ হাসান। কিন্তু এত টাকা কীভাবে নাজমুল তুলেছেন, সেটি নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হচ্ছে না।

পুলিশ কর্মকর্তা নুরুল হক জানান, মাসুদের হাসানের তিনটি ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিত তথ্য জানার জন্য ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। ঈদের ছুটির পর এসব তথ্য পেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে, কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় নাজমুল এতগুলো টাকা তুলেছেন।

মামলার কাগজপত্রের তথ্য বলছে, গত বছরের ২২ অক্টোবর থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত মাসুদ হাসানের ৩টি ব্যাংক হিসাব থেকে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা তুলে নেন নাজমুল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মাসুদ হাসানের ব্যাংক হিসাব থেকে কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের মামলাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। তত্ত্বাবধায়ক নাজমুলকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তাঁর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দির নারানদিয়া গ্রামে। বাবার নাম মো. ফারুক মিয়া।

ভুয়া ব্যাংক হিসাব বিবরণী দেন নাজমুল

অশীতিপর মাসুদ হাসান শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় বেশির ভাগ সময় বাসায় অবস্থান করতেন। ভবনের ভাড়াটেদের কাছ থেকে ভাড়া তোলাসহ বাসা দেখভালের জন্য আড়াই বছর আগে নাজমুল নামের ওই যুবককে বাসার তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। মাসিক বেতন ধরা হয় ২০ হাজার টাকা। ভাড়া তোলা থেকে শুরু করে যাবতীয় কাজে দক্ষতা দেখানোয় ধীরে ধীরে নাজমুলকে বিশ্বাস করতে শুরু করেন মাসুদ হাসান। একপর্যায়ে বাজার করা থেকে শুরু করে সব ধরনের কাজকর্ম নাজমুলকে দিয়ে করাতে থাকেন তিনি। সংসার খরচ, চিকিৎসা খরচসহ অন্যান্য খরচের জন্য বিভিন্ন সময় নাজমুলকে দিয়ে চেকের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করাতেন মাসুদ হাসান। তিনটি বেসরকারি ব্যাংকে তাঁর পৃথক তিনটি হিসাব রয়েছে।

৬ এপ্রিল মাসুদ হাসান নাজমুলকে বলেন, তিনটি ব্যাংক থেকে যেন বার্ষিক হিসাব বিবরণী তুলে আনেন। এরপর সেদিন নাজমুল একটি ব্যাংকের হিসাব বিবরণী মাসুদ হাসানকে দেন। তিনি দেখতে পান, ব্যাংকের হিসাব বিবরণীতে কোনো ব্যাংক কর্মকর্তার স্বাক্ষর ও সিল নেই। তখন মাসুদ হাসানের মনে সন্দেহ হয়। তিনি তাঁর ছোট ভাই রেজাউল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নিজের সন্দেহের কথা খুলে বলেন তাঁকে। এরপর রেজাউল হাসান ব্যাংক থেকে মাসুদ হাসানের তিনটি পৃথক হিসাব বিবরণী তুলে আনেন। তখন মাসুদ হাসান দেখতে পান, বিগত ছয় মাসে তাঁর তিনটি ব্যাংক হিসাব থেকে ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন নাজমুল। এ ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর নাজমুল কৌশলে বাসা থেকে পালিয়ে যান।

জানতে চাইলে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি আবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মাসুদ হাসান সাহেব একজন সরকারি প্রকৌশলী ছিলেন। অবসরে যাওয়ার পর পেনশনের টাকা এবং পৈতৃক জমি বিক্রির টাকা ব্যাংক হিসাবগুলোয় রেখেছিলেন। দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে নাজমুল তাঁর বিশ্বস্ত হয়ে ওঠেন। চেকের মাধ্যমে মাসুদ হাসানের ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা তুলতেন। পাশাপাশি মাসুদ হাসানের ব্যাংক হিসাবগুলোর মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের জন্য দেওয়া ওটিপি নম্বরও তিনি জানতেন। এসব তথ্য জানার পর বিগত সাত মাসে মাসুদ হাসানের এতগুলো টাকা তিনি উত্তোলন করেছেন।’

কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে নাজমুলের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে। তবে নাজমুলের বাবা মো. ফারুক মিয়া গত বুধবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘১০ দিন ধরে ছেলের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। সে কোথায় আছে জানি না। তবে বাসার একজন লোক আমাকে ফোন করে জানিয়েছেন, নাজমুল নাকি মালিকের অনেক টাকা আত্মসাৎ করেছে।’

যে কারণে কম সময়ে ছাড়া পেল এমভি আবদুল্লাহ

 

ছিনতাই হওয়ার পর প্রায় এক মাসের মাথায় মুক্তিপণ দিয়ে সোমালিয়ার উপকূল থেকে জিম্মি জাহাজ ছাড়িয়ে আনার নজির খুবই কম। সে তুলনায় এমভি আবদুল্লাহ দ্রুত সময়ে মুক্ত হয়েছে। জাহাজটির মালিকপক্ষ কেএসআরএম গ্রুপের আগের অভিজ্ঞতা ও দস্যুদের ওপর চাপ বাড়ায় সমঝোতার প্রক্রিয়া দ্রুত হয়েছে বলে মনে করেন সমঝোতার প্রক্রিয়ায় থাকা কর্মকর্তারা।

সোমালিয়ার দস্যুরা ভারত মহাসাগর থেকে এমভি আবদুল্লাহ জিম্মি করে ১২ মার্চ। মুক্তিপণ দিয়ে জাহাজটি ছাড়া পায় শনিবার দিবাগত রাত ১২টা ৮ মিনিটে, অর্থাৎ ১৪ এপ্রিল প্রথম প্রহরে। এ হিসাবে জিম্মি করার ৩২ দিন পর জাহাজটি মুক্তি পেয়েছে।
এর আগে ২০১০ সালে কেএসআরএম গ্রুপের আরেকটি জাহাজ এমভি জাহান মণি ছিনতাই করেছিল সোমালিয়ার দস্যুরা। ওই জাহাজ উদ্ধার করতে ৯৯ দিন সময় লেগেছিল।

এমভি আবদুল্লাহর আগে সর্বশেষ মুক্তিপণ ছাড়াই বুলগেরিয়ার জাহাজ এমভি রুয়েনকে উদ্ধার করা হয়। এমভি রুয়েন কমান্ডো অভিযান চালিয়ে ভারতীয় নৌবাহিনী উদ্ধার করে গত ১৬ মার্চ। তিন মাস জিম্মিদশায় ছিল জাহাজটি। এর আগে ইসরায়েলের একটি জাহাজ ছিনতাই করলেও সফল হয়নি দস্যুরা। এক দিনের মাথায় আন্তর্জাতিক নৌবাহিনী জাহাজটি উদ্ধার করে।

সোমালিয়ার উপকূলে দস্যুতা চরমে ওঠে ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত। ২০১২ সালের পর দস্যুতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ২০১৭ সালে দুটি জাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও উদ্ধার করা হয়। দস্যুতার হার যখন বেশি ছিল, তখনো গড়ে প্রতিটি জাহাজ উদ্ধারে কয়েক মাস সময় লেগেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা ওয়ান আর্থ ফিউচার ফাউন্ডেশন এক দশক আগে ‘ওশান্স বিয়ন্ড পাইরেসি’ প্রকল্পের আওতায় সোমালিয়া উপকূলে দস্যুতা নিয়ে সমীক্ষা চালায়। সংস্থাটির ‘দ্য ইকোনমিক কস্ট অব সোমালি পাইরেসি ২০১২’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ সালে ৩১টি জাহাজ মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছিল। প্রতিটি জাহাজ ছাড়া পেতে গড় সময় লেগেছে ১৭৮ দিন। ২০১২ সালে আটটি জাহাজ মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে গড়ে সময় লেগেছে ৩১৬ দিন।


কীভাবে এত দ্রুত জাহাজটি মুক্ত করা সম্ভব হলো-জানতে চাইলে কেএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত প্রথম আলোকে বলেন, ‘এমভি আবদুল্লাহ ছিনতাইয়ের পর প্রথম দিন থেকেই আমরা কাজ শুরু করি। নাবিকদের দ্রুত নিরাপদে ফেরানোই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। আগের অভিজ্ঞতা থাকায় দস্যুদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি সমঝোতার প্রক্রিয়াগুলোও আমরা গুছিয়ে এনেছিলাম। সোমালিয়ার উপকূলে দস্যুতার প্রবণতা বাড়ার পর আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীর তৎপরতা বাড়ায় দস্যুরাও চাপে ছিল। সরকারও নাবিকদের উদ্ধারে আমাদের সব রকমের সহযোগিতা করেছে। এতে খুব দ্রুত উদ্ধার সম্ভব হয়েছে।’

কেএসআরএম গ্রুপ ও বাণিজ্যিক জাহাজের দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এমভি জাহান মণির জিম্মির ঘটনার সময় দস্যুদের হাতে অনেকগুলো জাহাজ ছিল। সে সময় একের পর এক জাহাজ মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া হচ্ছিল। দস্যুদের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহ ছিল। ফলে মুক্তিপণের সমঝোতায় খুব তাড়া ছিল না দস্যুদের। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। দস্যুদের হাতে নগদ অর্থ নেই। গত নভেম্বর থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ ছিনতাই করলেও মুক্তিপণ ছাড়াই দুটি উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ শুধু বাংলাদেশি এমভি আবদুল্লাহ জিম্মি ছিল। ফলে দস্যুরাও যত দ্রুত সম্ভব নগদ অর্থ পাওয়ার চেষ্টায় ছিল। এ কারণে মালিকপক্ষ ও দস্যু-দুই পক্ষের বোঝাপড়া দ্রুত হয়েছে।


সোমালিয়ায় জিম্মি বাণিজ্যিক জাহাজের নাবিকদের দীর্ঘ সময় জিম্মি থাকার ঘটনা এমভি আলবেদো জাহাজের। মালয়েশিয়ার এই জাহাজের নাবিকদের ২০১০ সালের ২৬ নভেম্বর ছিনতাই করেছিল দস্যুরা। ২০১৩ সালের ৭ জুলাই জাহাজটি ডুবে যায়। ধাপে ধাপে নাবিকেরা সর্বশেষ মুক্তি পেয়েছিল ২০১৪ সালের ৭ জুন। অর্থাৎ এই জাহাজের নাবিকেরা মুক্তি পেতে ১ হাজার ২৮০ দিন বা সাড়ে ৩ বছর সময় লেগেছিল।

বাণিজ্যিক জাহাজ ছাড়া দীর্ঘ সময় জিম্মি রাখার ঘটনা ঘটেছিল একটি মাছ ধরার জাহাজের। মাছ ধরার জাহাজটির নাম এফবি প্রান্তলয়-১২। জাতিসংঘের মাদক এবং অপরাধবিষয়ক সংস্থা (ইউএনওডিসি) ২০১৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সোমালিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে জিম্মি রাখার ঘটনা এটি। ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল ছিনতাই হওয়া মাছ ধরার জাহাজটি মুক্ত হয়েছিল ২০১৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। জাহাজটির ২৪ জন নাবিকের মধ্যে ৬ জন নানা পর্যায়ে অসুস্থ হয়ে মারা যান। মিয়ানমারের ১৪ জন নাবিক মুক্তি পান ২০১১ সালে। সর্বশেষ ৪ জন মুক্তি পান ২০১৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ এই ৪ জন মুক্তি পেয়েছেন ৪ বছর ৩১৩ দিনে বা ১ হাজার ৭৭৪ দিনে।


বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এক দশক আগের চেয়ে এখনকার সোমালিয়ার উপকূলের পরিস্থিতি ভিন্ন। জলদস্যুদের হাতে ছিনতাই হওয়া জাহাজের সংখ্যা ছিল কম। দস্যুদের অর্থের প্রয়োজন ছিল বেশি। আবার জাহাজটির মালিকপক্ষ কেএসআরএম গ্রুপও দ্রুত সমঝোতা করতে চেয়েছিল। ফলে আগের ঘটনাগুলোর চেয়ে কম সময়ে এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের নাবিকদের মুক্ত করে আনা সম্ভব হয়।


Sunday, April 7, 2024

থানায় ‘হামলা’ চালিয়ে গ্রেপ্তার ‘নুরু বাহিনীর’ প্রধানের উত্থান যেভাবে


 

বগুড়ায় পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের কার্যালয়ে মো. নুরুজ্জামানসহ (সাদা পাঞ্জাবি) অন্য আসামিরা। গতকাল রোববার তোলা। ছবি: প্রথম আলো

বগুড়ার শাজাহানপুর এলাকায় একসময় অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ করতেন দুই ভাই মুন্না ও পান্না। তখন মুন্নার ফুট-ফরমাশ খাটতেন নুরু নামের একজন। সময় ও প্রেক্ষাপট বদলেছে। বদলেছে অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণকর্তাও। বদলায়নি শাজাহানপুর এলাকার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চিত্র। এলাকার নানা অপকর্মের নিয়ন্ত্রণ এখন সেই নুরুর হাতে।

নুরুর পুরো নাম মো. নুরুজ্জামান। শাজাহানপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মাঝিড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান। শাজাহানপুরের দাপুটে ‘নুরু বাহিনী’র প্রধান তিনি। শাজাহানপুর উপজেলা সদরের মাঝিড়া থেকে শুরু করে বনানী, ফুলতলা, নয়মাইল, আড়িয়াবাজার, সাবরুলসহ উপজেলাজুড়ে তাঁরা দাপিয়ে বেড়ান। নির্যাতনের ভয়ে তাঁদের অপকর্মের কথা বলতে সাহস পান না কেউ।

নিবার রাতে শাজাহানপুর থানায় ঢুকে অস্ত্র মামলার আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে নুরুজ্জামানসহ ৯ জনকে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসতে থাকে নানা অপকর্ম। শনিবারের রাতের হামলায় ৮ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ঘটনার পর নুরুজ্জামান ও তাঁর সহযোগীদের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১৫টি গুলিসহ দুটি বিদেশি পিস্তল, মাদক ও দেশি অস্ত্র জব্দ করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় নুরুজ্জামানসহ ৪৫ জনকে আসামি করে পৃথক আইনে দুটি মামলা হয়েছে। নুরুজ্জামান ছাড়া গ্রেপ্তার আসামিরা হলেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি সাইদুর রহমান, দপ্তর সম্পাদক বোরহান উদ্দিন, আড়িয়া ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মিঠুন হাসান, কর্মী সাদ্দাম রবীন, রমজান আলী, মিরাজুল রহমান, আমিনুল ইসলাম ও মিঠুন মিঞা।

শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নুরুজ্জামানের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতেই তাঁর বাসায় অভিযান চালিয়ে সাতটি গুলিসহ একটি বিদেশি পিস্তল জব্দ করা হয়। এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা হাসান নাজমুলের বাগানবাড়ি থেকে আটটি গুলিসহ একটি বিদেশি পিস্তল জব্দ করা হয়েছে। তবে নাজমুল পলাতক।

আরও পড়ুন
নুরুর পুরো নাম মো. নুরুজ্জামান। শাজাহানপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মাঝিড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান। শাজাহানপুরের দাপুটে ‘নুরু বাহিনী’র প্রধান তিনি।

কী হয়েছিল থানায়
শনিবার রাত ৯টার দিকে উপজেলার আড়িয়া বাজারে অভিযান চালিয়ে দুটি বার্মিজ চাকুসহ স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মিঠুন হাসানকে আটক করেন উপপরিদর্শক (এসআই) আনিসুর রহমান। তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে পুলিশকে ফোন করেন নুরুজ্জামান। কিন্তু পুলিশ মিঠুনকে ছেড়ে না দিয়ে থানায় নেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে ৩৫-৪০ জনকে নিয়ে থানায় যান নুরুজ্জামান। তাঁরা মিঠুনকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। বাধা দিলে পুলিশের সঙ্গে প্রথমে ধস্তাধস্তি হয়। পরে তাঁরা হামলা করলে এসআই আনিসুরসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। খবর পেয়ে থানায় আসেন ওসি শহীদুল। তখন ওসির সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ান নুরুজ্জামান। ওসি তাঁকে থানা থেকে বেরিয়ে যেতে বললে নুরুজ্জামান ও তাঁর সহযোগীরা পুলিশের ওপর হামলা করেন।
পুলিশ জানায়, পুলিশের প্রতিরোধের মুখে থানা থেকে বেরিয়ে মাঝিড়া বন্দরে তাঁরা নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে ২০০ থেকে ২৫০ জন ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন। তাঁদের হাতে ছিল লাঠিসোঁটা ও লোহার পাইপ। খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে গেলে তাঁরা ইটপাটকেল ছোড়েন। একপর্যায়ে লাঠিপেটা করে তাঁদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তখন ঘটনাস্থল থেকে নুরুজ্জামানসহ আটজনকে আটক করে থানায় আনা হয়। পরে থানায় আক্রমণ ও পুলিশের ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে রাতভর যৌথ অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এ ঘটনায় নুরুজ্জামানসহ ৪৫ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এই মামলায় আটক ৯ নেতাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া দুই নেতার বাসা থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল ও ১৫টি গুলি  উদ্ধারের ঘটনায় অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে।

মো. নুরুজ্জামান
মো. নুরুজ্জামান
ছবি: প্রথম আলো

কে এই নুরুজ্জামান
এলাকাবাসী, পুলিশ ও দলীয় সূত্রে জানা গেছে, নুরুজ্জামানকে অনেকেই ‘ঠ্যাং (পা) কাটা নুরু’ বলে ডাকেন। ১৯৯০-এর দশকে তিনি সন্ত্রাসী সাজেদুর রহমান মুন্নার সহচর ছিলেন। তাঁর হয়ে নানা অপকর্ম করেন। ২০০০ সালের পর জামায়াতের কর্মী হন। জামায়াত নেতা ও সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইয়াসিন আলীর বড় ছেলে সাবেক শিবির ক্যাডার রুবেলের সঙ্গে তাঁর সখ্য হয়। তখন তাঁর বিরুদ্ধে রুবেলের হয়ে টেন্ডারবাজি, ভূমি দখলসহ নানা কর্মকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগ আছে। বিনিময়ে নুরুজ্জামানকে মাঝিড়া বাজারের ইজারাদারি, মাঝিড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সভাপতিসহ বেশ কিছু সুবিধা পাইয়ে দেওয়া হয়।

এক-এগারোর পর স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রভাবশালী নেতা বনে যান তিনি। জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ এক নেতার আশীর্বাদে প্রথমে মাঝিড়া বন্দর স্বেচ্ছাসেবক লীগের আহ্বায়ক হন। পরে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন। বিগত ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে তিনি মাঝিড়া ইউপির চেয়ারম্যান হন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, মাঝিড়াপাড়ার দিনমজুর নূর আলমের প্রথম পক্ষের ছেলে নুরুজ্জামান। নূর আলম অবসরপ্রাপ্ত একজন সেনা কর্মকর্তার জমি পাহারা দিতেন। দারিদ্র্যের কারণে বিদ্যালয়ের পা মাড়াননি নুরুজ্জামান। শৈশবে কয়েক দিন হোটেলে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর মুন্না মাস্তানের ফুট-ফরমাশ খাটতেন। তাঁর সৎভাই নূর মোহাম্মদ শাজাহানপুরে যুবদলের রাজনীতি করেন।

গড়েছেন নিজস্ব বাহিনী ও টর্চার সেল
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাজাহানপুর উপজেলায় জমি দখল, ইটভাটায় মাটি সরবরাহ, ইট ও বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, হাটবাজারের ইজারার টেন্ডারবাজি, বিভিন্ন কারখানায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, দাদন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। মাঝিড়া ও আশপাশের কিছু যুবককে দিয়ে বিশাল ক্যাডার বাহিনী গড়ে তুলেছেন। তাঁরা নুরুজ্জামানের হয়ে চাঁদাবাজি, জমি ও বাড়ি দখল, কারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি করেন বলে অভিযোগ আছে। নিজের বাসায় বানিয়েছেন টর্চার সেল। নির্যাতনের ভয়ে কেউ তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পান না।
শাজাহানপুর সদরের বারুণীঘাটা মেলায় তেলি নামের এক ব্যক্তিকে হত্যার ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে। এ ছাড়া ২০১৫ সালে শাজাহানপুরের বুড়িতলা এলাকায় যুবলীগ নেতা সাজেদুর রহমানকে (সাজু মিয়া) পা কেটে হত্যার চেষ্টা হয়। তখন মাঝিড়া বন্দর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি ছিলেন নুরুজ্জামান।

ওই ঘটনায় সাজেদুরের বাবা আবদুল জব্বার বাদী হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। সাজেদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, আসামি নুরুজ্জামান মামলার বিচার বাধাগ্রস্ত করতে নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছেন। এখন সাক্ষ্য গ্রহণে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

গত বছরের মার্চে শাজাহানপুর ইউএনও কার্যালয় থেকে হাটের ইজারার ২২ লাখ টাকার পে-অর্ডারসহ দরপত্র ছিনতাইয়ের নেপথ্যেও নুরুজ্জামানের নাম উঠে আসে। তখন ইউএনও কার্যালয়ের কম্পিউটার অপারেটর মোজাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে মাঝিড়া ইউপির চেয়ারম্যানের পদ থেকে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

নুরুজ্জামান লোকজন নিয়ে উপস্থিত হয়ে নিলামে অংশ না নেওয়ার হুমকি দেন। প্রতিবাদ করলে হুংকার দিয়ে বলেন, ‘তোকে বাড়ি থেকে বের হতে দেখলেই ওপারে পাঠিয়ে দেব। বাঁচতে চাইলে চোখের সামনে পড়বি না।’
বাদশা আলমগীর, শাজাহানপুর উপজেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক

সূত্র জানায়, গত বছরের ২ মার্চ উপজেলার জমাদারপুকুর হাটের ইজারা পেতে দুজন দরপত্র দাখিল করেন। একজন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি সাজেদুর রহমান ও অন্যজন জেলা যুবলীগের সহসভাপতি আলহাজ শেখ। প্রথম পর্যায়ের দরপত্র দাখিল ও উন্মুক্তকরণ অনুষ্ঠানে দরপত্র ছিনতাই করে আরেকজনের হাত দিয়ে বাইরে পাঠিয়ে দেন নুরুজ্জামান। পরে একটি বানানো দরপত্র জমা দেওয়া হয়। স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা সাজেদুর রহমানকে ইজারা পাইয়ে দিতে দরপত্র ছিনতাই করা হয়।
দলীয় সূত্র জানায়, গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর উপজেলার রহিমাবাদ শালুকগাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবন ও গাছের নিলামকে কেন্দ্র করে উপজেলা যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক বাদশা আলমগীরকে হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে নুরুজ্জমানের বিরুদ্ধে। উপজেলা চেয়ারম্যানের কক্ষে ৫০-৬০ জনকে নিয়ে নিলামে অংশগ্রহণ করতে চাওয়ায় যুবলীগ নেতাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করায় উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আসাদুজ্জামানকেও হুমকি দেন।

বাদশা আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, ওই দিন উন্মুক্ত নিলাম ছিল। নুরুজ্জামান লোকজন নিয়ে উপস্থিত হয়ে নিলামে অংশ না নেওয়ার হুমকি দেন। প্রতিবাদ করলে হুংকার দিয়ে বলেন, ‘তোকে বাড়ি থেকে বের হতে দেখলেই ওপারে পাঠিয়ে দেব। বাঁচতে চাইলে চোখের সামনে পড়বি না।’ পরে ভয়ে তিনি আর নিলামে অংশ নেননি।
বিএনপি–জামায়াতকে পুনর্বাসনের অভিযোগ

নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে জামায়াত, ছাত্রশিবির, ছাত্রদল ও যুবদলের বেশ কয়েকজন নেতাকে স্বেচ্ছাসেবক লীগে পদ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একজন নেতা বলেন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের দপ্তর সম্পাদক বোরহান একসময় শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সাবেক শিবির ক্যাডার রুবেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রুবেলের সঙ্গে বিরোধের পর বোরহান নুরু বাহিনীতে যোগ দেন। পরে দপ্তর সম্পাদকের পদ পান। বোরহান চাঁদে সাঈদীকে দেখার গুজব ছড়ানোর ঘটনায় শাজাহানপুর ও সদর থানায় দুটি নাশকতা মামলার আসামি।

শাজাহানপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আবুল বাশারের সঙ্গেও ওঠাবসা ছিল নুরুজ্জামানের। উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওহাবুজ্জামান ২০১৩-১৪ সালে বিএনপির আন্দোলনের সময় উপজেলা ছাত্রদলের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধেও নাশকতার একাধিক মামলা ছিল। নুরুজ্জামান তাঁকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ দেন। শনিবার রাতের ঘটনায় নুরুজ্জামানের সঙ্গে তিনিও গ্রেপ্তার হয়েছেন।

নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি ত্যাগী নেতা। তাঁর মতো নেতা সংগঠনের প্রয়োজন।
সাজেদুর রহমান, বগুড়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি

একইভাবে উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক নেতা হাসান নাজমুলকে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক পদে বসানো হয়েছে। তাঁর বাসা থেকে বিদেশি পিস্তল জব্দ হয়েছে। সাবেক ছাত্রদল নেতা রাসেল মাহমুদ এখন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। সাইদুর রহমান শাজাহানপুর উপজেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচন করেছিলেন। নাশকতার মামলায় একাধিকবার জেলও খেটেছেন। তিনি সহসভাপতির পদ পেয়েছেন। শনিবার রাতে তিনিও গ্রেপ্তার হয়েছেন।

সন্ত্রাসী থেকে কোটিপতি

মুন্না মাস্তানের অনুসারী হিসেবে অপরাধজগতে বিচরণ নুরুজ্জামানের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওস্তাদকে টক্কর দেন। জমি দখলের মাধ্যমে যুবক বয়সে একসময় মুন্না মাস্তানের সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র কর্তা বনে যান। জমি দখল থেকে শুরু করে কারখানায় উপকরণ সরবরাহ, চাঁদাবাজি সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নেন। রাতারাতি ভাগ্য খুলে যায়। অল্প সময়ে প্রচুর সম্পদের মালিক বনে যান। রাতারাতি মাঝিড়া বন্দরে কয়েক কোটি টাকা দামের ৬ শতক জমি দখল করে গড়ে তোলেন চারতলা পাকা ভবন ও বাণিজ্যকেন্দ্র। পৈতৃক মাটির বাড়ি ছেড়ে ওই বাসায় ওঠেন। সেখানে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব কার্যালয়। বেসরকারি সংস্থার সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দাদন ব্যবসা করারও অভিযোগ আছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এক যুগ আগেও ছিঁচকে সন্ত্রাসী ছিলেন নুরুজ্জামান। নানা অপকর্মে জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতার ভাড়াটে ক্যাডার ছিলেন। রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে জমি দখলসহ অল্প দিনে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগে পদ পাওয়ার পর ওই আওয়ামী লীগ নেতাকে ছেড়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি সাজেদুর রহমানের (শাহীন) আশীর্বাদপুষ্ট নেতা হিসেবে পরিচিতি পান।

নুরুজ্জামান এক দশকে নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ আছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একাধিক নেতা বলেন, নুরুজ্জামানের বাবা নুরুল আলম পাহারাদার ছিলেন। থাকতেন মাটির ঘরে। কিন্তু নুরুজ্জামান থাকেন মাঝিড়া বন্দরে চারতলা বাসায়। চড়েন পৌনে এক কোটি টাকা দামের দুটি গাড়িতে। বেশ কয়েকটি ট্রাক, একটি ইটভাটা ছাড়াও কোটি টাকার ঠিকাদারি ব্যবসা আছে। ডমনপুকুর এলাকায় প্রায় ৪ একর আয়তনের পুকুর আছে।

জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি সাজেদুর রহমান অবশ্য নুরুজ্জামানের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তাঁর দাবি, নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সঠিক নয়। তিনি ত্যাগী নেতা। তাঁর মতো নেতা সংগঠনের প্রয়োজন। জামায়াতের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। উল্টো তাঁর কারণেই শাজাহানপুরে জামায়াত-বিএনপি কোণঠাসা। নুরুজ্জামান ষড়যন্ত্রের শিকার বলে তিনি দাবি করেন।

Wednesday, April 3, 2024

যৌন হয়রানি ঠেকানোর পথে বাধা দুর্বল আইনি কাঠামো

 

যৌন হয়রানির বিচার না পাওয়ায় আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। সম্প্রতি এ রকম একটি ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শাস্তির দাবিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা লাল কার্ড প্রদর্শন করেনছবি: দীপু মালাকার

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আমাদের আইনি কাঠামো খুবই দুর্বল। নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে একাধিক আইন থাকলেও সেই আইনগুলোয় ‘যৌন হয়রানি’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। শুধু ২০০৯ সালে করা একটি জনস্বার্থে মামলার রায়ে উচ্চ আদালত শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি বন্ধে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছিলেন, যাতে বলা হয়েছিল, আইন না হওয়া পর্যন্ত এই নির্দেশনাগুলোকে কর্তৃপক্ষ মানতে বাধ্য থাকবে।

এই নির্দেশনায় যেমন বলা হয়েছে, যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্ত করতে প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিযোগ কমিটি গঠন করতে হবে, তেমনি জোর দেওয়া হয়েছে প্রতিরোধমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও। তবে গত এক দশকে অভিযোগ কমিটি গঠনের বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে কিছুটা গুরুত্ব পেলেও, উপেক্ষিত রয়ে গেছে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধানগুলো।

যেমন উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নতুন সেশনের ক্লাস শুরু হওয়ার আগে একটি বাধ্যতামূলক ওরিয়েন্টেশন ক্লাস নিতে হবে, যেখানে জেন্ডার বৈষম্য ও যৌন হয়রানির বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সবার জন্য এ রকম সচেতনতামূলক নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে প্রতি মাসে একবার অথবা প্রতি ছয় মাসে অন্তত একবার। সরকারি পর্যায়ে সব স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তথ্য চাওয়া প্রয়োজন, এই ওরিয়েন্টেশন ও প্রশিক্ষণের ব্যাপারে তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে এ পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে।

আদালতের নির্দেশে আরও বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব থাকবে যৌন হয়রানি ও অন্যান্য যৌন অপরাধের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিধিবিধানসহ দেশের যেসব প্রচলিত আইন রয়েছে, তা বুকলেট আকারে প্রকাশ করা এবং এ-সংক্রান্ত তথ্য শিক্ষার্থীদের কাছে সহজবোধ্য ভাষায় পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু এ নির্দেশনার কোনো প্রয়োগ বাস্তবে দেখা যায় না।

যৌন হয়রানির বেশির ভাগ ঘটনাই যে অভিযোগ পর্যন্ত গড়ায় না তার অন্যতম একটি কারণ হলো, শিক্ষার্থীদের কাছে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিমালা ও এ-সংক্রান্ত আইনি নিয়মগুলো স্পষ্ট নয়। এছাড়া এ ব্যাপারে তথ্য পাওয়াও সহজ নয়। একটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি কমিটিতে কারা আছেন, কমিটিতে কীভাবে অভিযোগ করতে হবে, অভিযোগ করলে গোপনীয়তার সুরক্ষা হবে কি না? ভবিষ্যতে কোনো প্রতিশোধমূলক আচরণের শিকার হলে সুরক্ষার কী বিধান আছে? এসব বিষয়ে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে প্রতিষ্ঠানের সবাইকে।

আদালতের নির্দেশনা বলছে যে সরাসরি অভিযোগ কমিটির কাছে ‘মেইল’-এর মাধ্যমেও একজন অভিযোগকারী অভিযোগ জানাতে পারেন। আবার অভিযোগকারী চাইলে কমিটির যেকোনো একজন নারী সদস্যকে আলাদাভাবেও অভিযোগ জানাতে পারেন। অর্থাৎ কমিটির সদস্য কারা এবং তাঁদের সঙ্গে সরাসরি অভিযোগ জানানোর কী কী মাধ্যম রয়েছে, সেসব বিষয় নিয়ে স্পষ্ট তথ্য থাকতে হবে, নির্দেশনাও বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দেখা গেছে, গত দুই বছরে অভিযোগ এসেছে কোথাও মাত্র তিনটি, কোথাও পাঁচটি বা ছয়টি। প্রতিষ্ঠানের পরিধি আর শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনা করলে সংখ্যাটি যে সেই প্রতিষ্ঠানের যৌন হয়রানির প্রকৃত চিত্র তুলে ধরছে না, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় একাধিক বিভাগ থাকলেও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটিমাত্র অভিযোগ কমিটি থাকে। অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই যৌন হয়রানির মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির কাছে পৌঁছানো জটিল প্রক্রিয়া মনে হতে পারে। এ কারণে দেখা যায় হয়রানির মাত্রা চরম হলেই সাধারণত কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগের পথ বেছে নেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিভাগ অনুযায়ী একাধিক কমিটি গঠন করা যায় কি না, সে বিষয়টিও ভেবে দেখা দরকার।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যৌন হয়রানিমূলক আচরণ কী সেই বিষয়েও সংবেদনশীল, উন্মুক্ত এবং নিরপেক্ষ আলোচনা আর সংলাপের প্রয়োজন আছে। যৌন হয়রানি অপরাধটি বাংলাদেশের কোনো আইনেই সংজ্ঞায়িত করা নেই। এমনকি ২০০৯ সালের উচ্চ আদালতের যে নির্দেশনাটি রয়েছে সেখানেও যৌন হয়রানিকে সংজ্ঞায়িত করতে শুধুমাত্র যৌন হয়রানিমূলক আচরণের কিছু উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। এ কারণে সার্বিকভাবে যৌন হয়রানি বিষয়ে একটি অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

অনেক ক্ষেত্রে কিছু হয়রানিমূলক আচরণ এতটাই গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায় যে হয়রানির শিকার ব্যক্তিও একসময় মনে করেন যে বিষয়টি তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত এবং কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিকার দেওয়ার সুযোগ নেই। এ কারণেই কোন আচরণগুলি যৌন হয়রানিমূলক হবে সেই ব্যাপারেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। অন্তত ২০০৯ সালের আদালতের নির্দেশনায় যৌন হয়রানিমূলক আচরণকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে যেসব উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, সেই বিষয়গুলোও জানানো যেতে পারে।

যেমন ২০০৯ সালের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্লাসের বেঞ্চে লিখে রাখা কোন যৌন ইঙ্গিতময় শব্দ বা চিত্র অথবা অনুপযুক্ত কোন মোবাইল বার্তাও যে যৌন হয়রানিমূলক হতে পারে এবং আইনত এই ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করার সুযোগ আছে— এই বিষয়গুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব সদস্যদেরই অবগত থাকা প্রয়োজন।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণের বিষয়টিকেও নজরে আনতে হবে। উচ্চ আদালতে নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, কমিটি অভিযোগের তদন্ত শেষ করে কর্তৃপক্ষকে তাদের সুপারিশ জানাবে ৩০ দিনের মধ্যে। এটা প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ৬০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।

কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোয় উঠে এসেছে অনেক ক্ষেত্রেই এই সময়সীমার মধ্যে কমিটির রিপোর্ট প্রদান করতে পারে না। আবার কমিটি অভিযুক্ত ব্যক্তির শাস্তির সুপারিশ করলেও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব শৃঙ্খলামূলক বিধিবিধান মেনে সেই সুপারিশ কার্যকর করতে আরও দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে যায়।

গত কয়েক দিনের গণমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোয় উঠে এসেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগ পাওয়ার পর অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করা হয় একটি অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান কমিটি গঠনের মাধ্যমে। কিন্তু ২০০৯-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন অভিযোগকারী সরাসরি কমিটির কাছেই অভিযোগ জানাবেন এবং সেই অভিযোগের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হবে।

অভিযোগের তদন্ত যাতে পক্ষপাতদুষ্ট না হয়, সে কারণেই ২০০৯-এর নির্দেশনায় রয়েছে যে কমিটিতে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকে অন্ততপক্ষে দুজন বহিস্থ সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ আরেকটি কমিটির মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে অভিযোগ যাচাই করা হয়, সেখানে যদি প্রতিষ্ঠানের বাইরের সদস্য অনুপস্থিত থাকেন, সে ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার শর্তটি অকার্যকর হয়ে যেতে পারে।

আবার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব শৃঙ্খলা সম্পর্কিত বিধি-বিধান এর সঙ্গে যৌন হয়রানির নীতিমালাকে সমন্বয় করতে হবে। এটা করতে না পারলে অনেক সময় অভিযুক্ত ব্যক্তির আপিলে যৌন হয়রানি কমিটির সিদ্ধান্ত উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে যেতে পারে। এ কারণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ২০০৯-এর নির্দেশনার আলোকে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। এর ফলে একটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানির অভিযোগ তদন্তের প্রক্রিয়া কেমন হবে এবং প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান অন্যান্য শৃঙ্খলামূলক বিধির সঙ্গে তা কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা সুস্পষ্ট করা যাবে।

একটি প্রতিষ্ঠান তার দায়িত্ব পালন করছে কি না, সেটি দেখার জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জবাবদিহিমূলক তত্ত্বাবধানের কাঠামো তৈরি করতে হবে। ২০০৯-এর নির্দেশে বলা হয়েছে, এই নির্দেশনার প্রতিপালনের চিত্র তুলে ধরে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে গঠিত কমিটি সরকারকে একটি বার্ষিক প্রতিবেদন জমা দেবে।

কিন্তু সরকারের কোন দপ্তরে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে, কী থাকবে প্রতিবেদনে আর কীভাবে সেই প্রতিবেদন মূল্যায়ন করা হবে, সে বিষয়ে নির্দেশনায় কিছু বলা নেই। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি আইন অনুযায়ী নীতিমালা প্রণয়ন না করে বা যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং প্রতিকারের পদক্ষেপগুলো না নেয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে সেই বিষয়টিতেও সুস্পষ্ট বিধান থাকতে হবে।

রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য তাই একটি আইনগত তত্ত্বাবধানের কাঠামোর প্রয়োজন আছে। আর এ কারণেই অনেক বছর ধরেই বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো যৌন হয়রানি প্রতিরোধে একটি আলাদা আইনের দাবি করে আসছে। যৌন হয়রানি রোধে এই পৃথক আইন কতটা কার্যকর হতে পারে এবং এর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে কী ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে হবে, তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি মেয়েকে স্কুল-কলেজের গণ্ডি পার হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আসতে পারিবারিক, অর্থনৈতিক এবং আরো অনেক সামাজিক বাধা পার হতে হয়। সেই মেয়েটি নিরাপত্তার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঝরে যাবে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে তার সামাজিক উন্নয়নের অগ্রাধিকার তালিকায় নারী ও শিশুশিক্ষার গুরুত্বকে স্থান দিয়েছে। একইভাবে এখন নারী ও শিশুর নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও অগ্রাধিকার দেওয়া অতি জরুরি। নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ এখন সময়ের দাবি।