Tuesday, September 24, 2024

রাজনীতি ঠিক না হলে ব্যাংক সংস্কার টেকসই হবে না

 

অর্থনীতি খারাপ হয়ে পড়লে সরকারের পতন হয়। বাংলাদেশেও তা–ই হয়েছে। অর্থনৈতিক নিষ্পেষণ, দুর্নীতি ও ভোটাধিকার হরণের কারণে সরকারের পতন হয়েছে। রাজনৈতিক কারণে কিছু ভালো ব্যাংক দুর্বল হয়েছে। এক পরিবারের কাছে ৮-৯টি ব্যাংক তুলে দেওয়া হয়েছে। ৪-৫টি পরিবার ব্যাংক থেকে ২ লাখ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। বিস্ফোরণোন্মুখ এই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করে যাচ্ছে। টাকা ছাপানো বন্ধ, সঙ্গে বন্ধ রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রিও। এই নীতি স্থিতিশীল হলে মূল্যস্ফীতি কমতে বাধ্য। এতে সবাই স্বস্তিতে থাকবে। ব্যাংক খাত সংস্কারে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে রাজনীতি ঠিক না হলে ব্যাংক খাতের সংস্কারগুলো টেকসই হবে না। সুতরাং সংস্কার উদ্যোগ টেকসই করতে হলে রাজনীতিতেও সংস্কার আনতে হবে।

প্রথম আলো আয়োজিত ‘ব্যাংক খাতকে কোথায় দেখতে চাই’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। ব্যাংকার, ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদেরা এ সময় ব্যাংক খাতের নানা অনিয়ম, সমস্যা, সমাধান এবং তা টেকসইয়ের উপায় তুলে ধরেন।

প্রথম আলো কার্যালয়ে গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ, ইস্টার্ণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী রেজা ইফতেখার, গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক মনজুর হোসেন, দি সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার, ব্যাংক এশিয়ার চেয়ারম্যান রোমো রউফ চৌধুরী, ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবীব, লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের এমডি হুমায়রা আজম ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী।

আলোচনার শুরুতে সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান এবং সঞ্চালনা করেন হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন।

প্রধান চ্যালেঞ্জ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কাজ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, এ জন্য কোনো টাকা ছাপানো হচ্ছে না। শুধু পোশাকশ্রমিকদের বেতন দিতে এক হাজার কোটি টাকা ছাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। রিজার্ভ থেকেও ডলার বিক্রি করা হচ্ছে না। খোলাবাজারে ডলারের দাম ব্যাংকের চেয়ে কমে গেছে। এভাবে চললে বিনিময় হার স্থিতিশীল হয়ে যাবে। এখন যেসব ব্যাংকের টাকার প্রয়োজন হচ্ছে, তা না ছাপিয়ে অন্য ব্যাংক থেকে জোগান দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে।

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘মানুষের ক্ষোভ ও কষ্ট কমাতে পারলে সেটা বড় অর্জন হবে। টাকা ছাপিয়ে সাময়িক স্বস্তি মিললেও সমস্যার সমাধান হবে না। মানুষের কষ্ট আরও বাড়বে। এ জন্য টাকা না ছাপানো ও ডলার বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ যথাযথ বলে মত দেন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি এ কে আজাদ। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জায়গা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব উদ্যোগ নিচ্ছে, সেগুলো ঠিক আছে। তবে শিল্পের কথা ভাবা হয়নি। ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ৯ শতাংশ সুদে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করেছেন। এখন ব্যাংকঋণের সুদ সাড়ে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ। সুদের হার আরও বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা কীভাবে ঋণের অর্থ পরিশোধ করবেন, সেটি ভাবা উচিত ছিল।

এ কে আজাদ বলেন, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার কমানো হয়েছে। সুদের হার বাড়ানো হয়েছে। ইডিএফ রপ্তানিকারকদের জন্য ভর্তুকি হিসেবে কাজ করছে। বিকল্প হিসেবে অফশোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা থাকলে সবাই সেটি নিতে পারবে না। ফলে রপ্তানি কমতে পারে।

সুদহারের সঙ্গে বিনিয়োগের সম্পর্ক

ব্যাংক এশিয়ার চেয়ারম্যান রোমো রউফ চৌধুরী বলেন, ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয় হবে ঋণের সুদহার। ১৫ শতাংশ ব্যাংকসুদে শিল্পকারখানা করে সফল হওয়া কঠিন। সুদহার বাড়লে সেটা ব্যাংকারদের জন্য খুশির খবর। কারণ, তাতে সুদ আয় বাড়বে। কিন্তু এর ফলে খেলাপি ঋণও বেড়ে যাবে।

সুদহারের সঙ্গে বিনিয়োগের সম্পর্ক নেই উল্লেখ করে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, স্বাধীনতার পর দেশের উদ্যোক্তা শ্রেণি তৈরি করেছে এই ব্যাংক খাত। কিন্তু এই খাত ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে। সুদহারের কথা বলা হয়; এটা অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। কিন্তু সুদহারের সঙ্গে বিনিয়োগের সম্পর্ক তেমন একটা দেখা যায় না। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে অনেক ধরনের উদার নীতি প্রণয়ন করা হয়েছে, তাতেও বিশেষ কাজ হয়নি; বরং একধরনের দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে।

ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘আমরা দুর্বৃত্তায়নমুক্ত, সচল ও টেকসই ব্যাংকিং খাত দেখতে চাই। স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি পদক্ষেপ দরকার। স্বল্প মেয়াদে বা তাৎক্ষণিকভাবে অনেকটা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’

এই প্রসঙ্গে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ৬-৯ সুদহার করেও বিনিয়োগ বাড়ানো যায়নি। এ জন্য সব লেনদেন বাজারভিত্তিক করা হচ্ছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা না ফিরলে বিনিয়োগ হবে না। এ জন্য ছয় মাস সময় দিতে হবে। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিলের আকার কমানো হবে না। আরও এক বিলিয়ন ডলার যুক্ত হবে।

গভর্নর বলেন, ‘সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা ধার নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এটাকে ৮০-৮৫ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনতে বলেছি। ফলে বেসরকারি খাত ৫০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি ঋণ নিতে পারবে।’

খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গ

বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক মনজুর হোসেন বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আমাদের জন্য আরেকটি সমস্যা। এই সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বর্তমানে যে খেলাপি ঋণের কথা বলা হচ্ছে, সেটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যে আসতে হবে।’

বিআইবিএমের অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবীব বলেন, পৃথিবীর এমন কোনো ব্যাংক নেই, যেখানে খেলাপি ঋণ নেই। ইচ্ছাকৃত খেলাপি খারাপ। যারা অনিচ্ছাকৃত খেলাপি, তাদের সহায়তা করতে হবে, আর যারা ইচ্ছাকৃত তাদের শাস্তি দেওয়া, জেলে নিতে হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণের সংজ্ঞা ঠিক করতে হবে।

মো. আহসান হাবীব বলেন, খেলাপি ঋণ বেশি হয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঋণ থেকে। কারণ, এ ধরনের বাণিজ্যের সব তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংক সংগ্রহ করে না। এর সূত্রপাত হয় ব্যাক টু ব্যাক ঋণপত্র থেকে। এই বাণিজ্যেই ৭০-৮০ শতাংশ জালিয়াতি ও অর্থ পাচার হয়।

ব্যাংক এশিয়ার চেয়ারম্যান রোমো রউফ চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক বেশি। আমরা যেসব প্রতিষ্ঠানকে অর্থায়ন করি, তাদের বেশির ভাগই ঋণ ফেরত দিতে নানা সমস্যায় পড়ে। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের কারণে কর্মমূল্যায়ন বিবেচনায় ব্যাংকে চাকরিচ্যুত করা যায় না।’

রোমো রউফ চৌধুরী বলেন, ‘ব্যাংকিং নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমাদের আশপাশের দেশ ও অঞ্চলের চর্চাগুলোকে আমরা বিবেচনায় নিতে পারি। অনেক সময় দেখা যায়, বিভিন্ন খাতের ভালো ও সফল উদ্যোক্তারা ব্যাংকের পরিচালনায় এসে আর ভালো কিছু করতে পারেন না। এর বড় কারণ রাজনৈতিক চাপ। এ ছাড়া বৈরী পরিবেশ ও নীতিও বড় কারণ। এমন একটি ব্যবস্থা করা দরকার, শুধু টাকা থাকলেই যে কেউ যাতে ব্যাংকের মালিকানায় চলে আসতে না পারে।’

ব্যাংক খাতে রাজনীতি

সিটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান আজিজ আল কায়সার বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা রাজনৈতিক হেনস্তার শিকার। ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও পর্ষদ সদস্য হিসেবেও হেনস্তার শিকার হয়েছি। রাজনৈতিকভাবে কেউ কেউ এমন সুবিধা পেতেন যে আমরা প্রতিযোগিতা সক্ষম থাকতাম না। রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পাওয়া একটি পরিবার আট-নয়টি ব্যাংকের মালিকানা পেয়েছে। সেটি কীভাবে সম্ভব? অথচ আমাদের বলা হচ্ছে, ব্যাংকে একটি পরিবারের শেয়ার ১০ শতাংশের বেশি হতে পারব না।’

ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বলেন, রাজনৈতিক কারণে কিছু ভালো ব্যাংক দুর্বল হয়েছে। কিছু ব্যাংকের উদ্দেশ্য ভালো ছিল, কিন্তু নানা কারণে দুর্বল হয়েছে। এ জন্য ব্যাংকের পূর্বাবস্থা যাচাই–বাছাই করে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। একটু সহায়তা দিলে কিছু ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াবে। তাই ব্যাংক খাত সংস্কারে সময়ক্ষেপণ করা উচিত হবে না। ব্যাংক খাতের ক্ষতির প্রভাব পড়েছে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে।

আবদুল মান্নান বলেন, ‘সাত বছর আগে ব্যাংক খাত যে অবস্থায় দেখেছি, সাত বছর পর এসে সেই অবস্থায় নেই। ব্যাংক চলেছে মুদিদোকানের মতো। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই পর্যন্ত ১১টি ব্যাংকের পর্ষদ পরিবর্তন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন সাহসী সিদ্ধান্তগুলোয় আশ্বস্ত হচ্ছি।’

গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘অর্থনীতি খারাপ হয়ে পড়লে সরকার পতন হয়। বাংলাদেশেও তা–ই হয়েছে। অর্থনৈতিক নিষ্পেষণ, দুর্নীতি ও ভোটাধিকার হরণের কারণে সরকার পতন হয়েছে। বিস্ফোরণোন্মুখ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে আমাদের সমস্যা হয়নি, আমরা ভাগ্যবান। ৪–৫টি পরিবার ব্যাংক থেকে ২ লাখ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। এতে অর্থনীতিতে মন্দা নেমে আসতে পারত, সেটা হয়নি। রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করলে ছয় মাস পর শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতি হয়ে যাবে। এটা কোনো সমাধান হতে পারে না। এ জন্য আমাদের কিছুদিন কষ্ট করতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুশাদ ফরিদী বলেন, ব্যাংক খাত রুগ্‌ণ হয়ে পড়েছে। মানুষের মনে একধরনের ভীতি আছে। অনেকেই জানতে চান, কোন ব্যাংকে টাকা রাখা নিরাপদ? নতুন সরকার আসার পর মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হলেও অনিশ্চয়তার বোধ এখনো আছে। সে জন্য বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার। রুগ্‌ণ ব্যাংক টিকিয়ে রাখা হলে ভালো ব্যাংকেও তার প্রভাব পড়ে। এই খাত মানুষের আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

সংস্কার কত দূর

বিআইডিএসের মনজুর হোসেন বলেন, গত এক দশকে করপোরেট সুশাসনের কাঠামোয় অনেক ক্ষতি করা হয়েছে। এ সময়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনে কয়েকবার পরিবর্তন করা হয়েছে। এ পরিবর্তন হয়েছে স্বজনতোষী ও ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়ার জন্য। অন্তর্বর্তী সরকার এ ক্ষেত্রে কতটা কাজ করতে পারবে, তা দেখার বিষয়; তবে সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

আলোচনায় গভর্নর বলেন, ‘আর্থিক খাতে সমস্যা কী, সেটা আমরা জানি—এ জন্য কমিশন না করে কাজ শুরু করে দিয়েছি। এ জন্য তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করা হবে, ইতিমধ্যে একটা গঠন করা হয়েছে। ১০-১১ ব্যাংকের পর্ষদ পরিবর্তন করে দেওয়া হয়েছে। এসব ব্যাংককে নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে। স্বস্তির বিষয়, এত কিছুর পরও এসব ব্যাংকে ৮০০ কোটি টাকা আমানত বেড়েছে। মানুষ এখন এসব ব্যাংকে টাকা জমা করছে।’

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে এসব ব্যাংককে কীভাবে সহায়তা দেওয়া যায়, তা দেখছি। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের সহায়তা প্রয়োজন হবে না। ফলে সহায়তার আকার অর্ধেক কমে গেছে। এসব ব্যাংকের আমানতকারীরা ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছেন। এক বছর সময় দিলে এসব ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াবে। গ্রাহকেরা অপ্রয়োজনে টাকা উত্তোলন করতে গেলে সমস্যা বাড়বে। দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দেখে কত টাকার গ্যারান্টি সুবিধা পাবে, তা নির্ধারণ করা হচ্ছে। গ্যারান্টি দিলেও পুরো টাকা একবারে দেওয়া হবে না। এই মডেলে কাজ না হলে অন্য উপায় ভাবতে হবে।’

গভর্নর বলেন, শেয়ার বিক্রি করে দুর্বল ব্যাংকের টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হবে। এ ছাড়া সরকার ও বিদেশি সংস্থা থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগানোর পরিকল্পনা আছে। তবে রাজনীতি সংস্কার না হলে অর্থনীতির সংস্কার টেকসই হবে না।

দুর্বল ব্যাংককে তারল্য–সহায়তা প্রসঙ্গে ইস্টার্ণ ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখার বলেন, ‘আমরা অবশ্যই দুর্বল ব্যাংককে সাহায্য করতে চাই। কিন্তু আমাদের ব্যাংককে যখন বিদেশি কোনো সংস্থা নিরীক্ষা করতে আসবে, তখন যদি দেখে কোনো তথ্য–উপাত্ত ছাড়াই দুর্বল ব্যাংককে ঋণ দিয়েছি; তাহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। কোনো ব্যাংক অর্থ ফেরত দিতে না পারলে গ্যারান্টার হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে যাব। এটা আমার কাছে খুবই বিব্রতকর হবে যে আমি অর্থ ফেরত চাইতে আমার নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্বারস্থ হচ্ছি।’

আলী রেজা ইফতেখার বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়া রাতের আঁধারে চূড়ান্ত করা হয়েছে। আইনটি আরও সংশোধন করে সমৃদ্ধ করা যায়।

লংকাবাংলা ফাইন্যান্সের এমডি হুমায়রা আজম বলেন, যদি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভালো হয় আর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ভালো না হয়, তাহলে সুশাসন নিশ্চিত করা যাবে না। এই যে এতগুলো ব্যাংকে লুটপাট হয়ে গেল, সেখানে এমডিরা কী করেছেন? তাঁদের সততা কোথায় ছিল? বর্তমানে ব্যাংক খাত যে অবস্থায় আছে, তাতে কিছু ব্যাংকের জন্য লভ্যাংশ বিতরণ কয়েক বছরের জন্য বন্ধ করে দেওয়া দরকার। এ ছাড়া ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতেও বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। এই খাতের জন্য আলাদা কিছু নীতিও দরকার, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলো ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে।

Monday, September 23, 2024

চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান কমিটি থেকে সরে দাঁড়ানোর কারণ জানালেন ইলিয়াস কাঞ্চন

 

সপ্তাহখানেক আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরিবোর্ড গঠন হয়েছে। এরই মধ্যে জুরিবোর্ড সদস্যরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে গিয়ে একটি সভা করেছেন। আজ সোমবার দুপুরে জানা গেল, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৩ জুরিবোর্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন চলচ্চিত্র অভিনয়শিল্পী ইলিয়াস কাঞ্চন। এরই মধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে মুঠোফোনে তা জানিয়েও দিয়েছেন। প্রথম আলোকে খবরটি নিশ্চিত করেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন।

আজ সোমবার দুপুরে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘সময়ের অভাবে এই জুরি কমিটিতে থাকতে পারবেন না। কমিটি ঘোষণার পরদিন একটা মিটিং হয়, আমি সেখানে গিয়ে থাকতে না পারার কথাটা জানিয়েছিলাম। তাঁরা আমাকে বলেছিলেন, থাকেন। কিন্তু আমি পারছি না। নিরাপদ সড়ক চাই নিয়ে আমি ৩২ বছর ধরে কাজ করছি। এই কাজটি করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। এখানে বেশি সময় দিতে হয়।’

 ইলিয়াস কাঞ্চন
ইলিয়াস কাঞ্চন
ছবি : সংগৃহীত

কথা প্রসঙ্গে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘কয়েক দিন আগে আমাকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে ফোন করে চলচ্চিত্রের সার্বিক কল্যাণে একটি কমিটি করার কথা বলা হয়। আমাকে থাকার ব্যাপারে অনুরোধ করা হয়। আমি তখন বলেছি, কারা কারা থাকবেন, তার বিস্তারিত আমাকে জানতে হবে। তারপর তারা বলল, সব আনুষ্ঠানিকতা কমপ্লিট করে আপনার সঙ্গে এসে দেখা করব। তারপর এ বিষয়ে বিস্তারিত বলব। হঠাৎ দেখলাম চলচ্চিত্র শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট হলো, সেন্সর বোর্ড হলো, জুরিবোর্ড হলো। আমার নাম এল জুরিবোর্ডে। নাম আসার পরদিনই একটা মিটিং ডাকল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। তারপরও ভাবলাম, মিটিংয়ে যাই, আমার কথাগুলো সেখানে গিয়ে নাহয় বলি। আমি ওখানে গেলাম। দেখলাম, সব কমিটির একই সঙ্গে মিটিং।’

ইলিয়াস কাঞ্চন আরও বলেন, ‘এ ধরনের কাজে আমাকে অনেকবার বলা হয়েছে। যাইনি। শিল্পী সমিতির সভাপতি থাকা অবস্থায়ও তো পদাধিকারবলে এসব জায়গায় থাকার সুযোগ ছিল। কিন্তু থাকিনি। এর আগে যাঁরা এ–জাতীয় কমিটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁরাও বলেছিলেন, থাকিনি। কিন্তু চলচ্চিত্রের মানুষের কল্যাণের জন্য গঠিত চলচ্চিত্র শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট কমিটির মধ্যে দেখলাম আমার নামটামই নাই, আমাকে যেটার কথা বলেছিল। চলচ্চিত্রের মানুষের কল্যাণে বৃহত্তর কোনো কাজে গঠিত কর্মকাণ্ডে অনেক কষ্ট সত্ত্বেও থাকতে পারলে ভালো লাগত। সবকিছু মিলিয়ে পুরস্কার কমিটিতে থাকাটাকে তাই যুক্তিযুক্ত মনে করিনি।’

ইলিয়াস কাঞ্চন
ইলিয়াস কাঞ্চন
ছবি: সংগৃহীত

সবশেষে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘পুরস্কারের জুরিবোর্ডে যেকোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তি থাকতে পারেন। এখানে ইলিয়াস কাঞ্চনকে থাকতে হবে বলে আমি মনে করি না।’
১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০২৩ প্রদানের উদ্দেশ্যে ‘জুরিবোর্ড’ পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন জারি করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। সেখানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে (চলচ্চিত্র) সভাপতি করে মোট ১৩ সদস্যের নাম প্রকাশ করা হয়। এতে সদস্যসচিব হিসেবে রাখা হয় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যানকে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের মহাপরিচালক এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের চলচ্চিত্র অধিশাখার প্রধান করা হয়।

ইলিয়াস কাঞ্চন ছাড়া জুরিবোর্ডের অন্য সদস্যদের তালিকায় ছিলেন নির্মাতা জাহিদুর রহিম অঞ্জন, সংগীত পরিচালক প্রিন্স মাহমুদ, অভিনেত্রী অপি করিম, সংগীতশিল্পী নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি, চিত্রগ্রাহক বরকত হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন, ফিল্ম ও ফটোগ্রাফি বিভাগের সভাপতি এস এম ইমরান হোসেন ও সাংবাদিক ওয়াহিদ সুজন।

মাহবুব উদ্দিন খোকনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ বিএনপির

 

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বিএনপি। সম্প্রতি নোয়াখালীতে নিজের নির্বাচনী এলাকায় মোটর শোভাযাত্রা করায় তাঁকে এই নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। আজ সোমবার বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে এই কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়।

৮ সেপ্টেম্বর এক চিঠিতে জনগণকে দুর্ভোগের মধ্যে না ফেলে মোটরসাইকেলের বহর বা অন্য কোনো যানবাহনে শোভাযাত্রা পরিহার করার জন্য নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা দিয়েছিল বিএনপি। এ ছাড়া পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন প্রদর্শন করা থেকে নেতা-কর্মীদের বিরত থাকার জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিল, সব সাংগঠনিক জেলা ও মহানগর এবং এর সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে এ–সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়।

ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, এরই মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ঢাকাসহ সারা দেশে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা রঙবেরঙের পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুন প্রদর্শন করছেন। এটি অত্যন্ত দৃষ্টিকটু, অনভিপ্রেত এবং দলের শৃঙ্খলা পরিপন্থী। দলের অতি উৎসাহী কতিপয় নেতা নিজেদের ছবি–সংবলিত পোস্টার প্রকাশ করছেন এবং ফেস্টুন ও ব্যানার ঝুলিয়ে রাখছেন। এ ধরনের পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন প্রদর্শন করা থেকে নেতা-কর্মীদের বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হচ্

রয়টার্সকে সাক্ষাৎকার ১৮ মাসের মধ্যে যাতে নির্বাচন হয়, সে জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থনের অঙ্গীকার সেনাপ্রধানের

 

যেকোনো পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থনের অঙ্গীকার করেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। আগামী ১৮ মাসের মধ্যে যাতে নির্বাচন হতে পারে, সে জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলো সম্পন্ন করতে সরকারকে সমর্থনের অঙ্গীকার করেছেন তিনি।

গতকাল সোমবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।

ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান। পরে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।

গতকাল রাজধানী ঢাকায় নিজ কার্যালয়ে বসে রয়টার্সকে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেন, নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি তাঁর পূর্ণ সমর্থন আছে। সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করার একটি রূপরেখা দেন তিনি।

ড. ইউনূস প্রসঙ্গে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান বলেন, ‘আমি তাঁর পাশে থাকব, যা-ই হোক না কেন, যাতে তিনি তাঁর মিশন সম্পন্ন করতে পারেন।’

বিশ্বব্যাপী ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের অগ্রদূত ড. ইউনূস। তিনি বাংলাদেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ সুগম করতে বিচার বিভাগ, পুলিশ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির কয়েক সপ্তাহ আগেই সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি বলেন, এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটানো উচিত। তবে তিনি ধৈর্য ধরার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন

Sunday, September 22, 2024

শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি প্রকাশ্যে এলেন, নানা আলোচনা

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কমিটি আছে এবং সেই কমিটির সভাপতি সাদিক কায়েম—সেটা অবশেষে প্রকাশ্যে এল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে গতকাল শনিবার মতবিনিময় সভায় যোগ দেওয়ার পর গণমাধ্যমে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে বক্তব্য দেন সাদিক। এরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া আসে।

কেউ কেউ সাদিকের সঙ্গে পরিচয় থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় না জানা ও বুঝতে না পারা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। কেউ কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের প্রকাশ্য রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ জানান।

কয়েকটি ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রশাসনের মিথস্ক্রিয়ার আনুষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্ম পরিবেশ পরিষদে ১৯৯০ সালে শিবির ও জাতীয় পার্টির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রসমাজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনীতি করতে না দেওয়ার বিষয়ে মতৈক্য হয়েছিল।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতন হয়। তাদের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দলটির ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণ করত। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে শিবিরকে কোনো কার্যক্রম চালাতে দেয়নি। শিবির সন্দেহে তারা অনেককে মারধর ও হল ছাড়তে বাধ্য করেছে। অবশ্য সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে গত জুলাইয়ে ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস ছাড়া করা হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে শনিবার আলোচনার প্রথম পর্বে অংশ নেন শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সাদিক। এই পর্বে ছিলেন গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল ও বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের নেতারা।

মতবিনিময় সভায় শিবিরের পক্ষ থেকে উপাচার্যের কাছে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের পরিবর্তে সংস্কার ও অবিলম্বে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দাবি করা হয়।

সভা শেষে সাদিক প্রথম আলোকে বলেন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা কোনো প্রাজ্ঞ সিদ্ধান্ত নয়। তাঁরা সব ছাত্রসংগঠনকে নিয়ে সংলাপের আয়োজন করতে বলেছেন, যেখানে ফ্যাসিবাদের দোসর ছাড়া সব ছাত্রসংগঠন আসবে। শিবির মেধাভিত্তিক রাজনীতি চায় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেকে প্রত্যেকের রাজনৈতিক চর্চা করবে, সবার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কারও ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না, সেটাই আমাদের চাওয়া।’

ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠনকে ফ্যাসিবাদের দোসর উল্লেখ করে সাদিক বলেন, তাদের রাজনীতি করার অধিকার নেই।

সাদিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র। তাঁর স্নাতকোত্তর শেষ। তিনি থাকতেন মাস্টারদা সূর্য সেন হলে। গত জানুয়ারিতে শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হওয়ার আগে তিনি সংগঠনের সূর্য সেন হল শাখার সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

সাদিকের সঙ্গে শনিবার মতবিনিময় সভায় শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আরেক নেতা রেজাউল ইসলাম অংশ নেন। তবে রেজাউলের ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যায়নি। সাদিক ও রেজাউল ছাড়া শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার অন্য নেতাদের কারও পরিচয় এখনো সামনে আসেনি।

কমিটির বিষয়ে সাদিক আজ রোববার দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের কমিটি খুব দ্রুত প্রকাশ করা হবে। বিগত সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী সরকার তাঁদের আন্ডারগ্রাউন্ড পলিটিকস (গোপনে রাজনীতি) করতে বাধ্য করেছে।

সাদিক কায়েম গতকাল শনিবার এই ফেসবুক পোস্টে ইসলামী ছাত্র শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালনের কথা জানান
সাদিক কায়েম গতকাল শনিবার এই ফেসবুক পোস্টে ইসলামী ছাত্র শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালনের কথা জানান
সাদিক কায়েমের ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট

ছাত্রলীগ বিতাড়িত হওয়ার পর এখন শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন ব্যানারে রাজনীতি করছে এবং হলগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে—কারও কারও এমন বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সাদিক বলেন, শিবিরের সমর্থকদের বেশির ভাগ হলের বাইরে থাকেন। কিছু নিয়মিত শিক্ষার্থী হলে থাকতে পারেন। গোপনে শিবির সব নিয়ন্ত্রণ করছে, এটা ঠিক নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শনিবারের সভাটি পরিবেশ পরিষদের ব্যানারে ডাকা হয়নি। শিবিরের দুজন নেতা সভাটিতে অংশ নেওয়ার পর এ নিয়ে উপাচার্যের সামনে প্রশ্ন তোলেন কয়েকটি বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতারা।

ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ শনিবারের মতবিনিময় সভায় উপাচার্যকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি কীভাবে তাঁকে (শিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি) খুঁজে পেলেন?’

উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান তাঁর এই প্রশ্নের কোনো জবাব দেননি বলে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন মাঈন আহমেদ। মাঈন ছাড়াও গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ (বাসদ) কয়েকটি বাম ছাত্রসংগঠনের নেতারা সভায় শিবিরের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

১৯৯০ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ পরিষদে জাতীয় ছাত্রসমাজ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়, তখন সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের অন্যতম নেতা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমানে বিএনপি নেতা খায়রুল কবির খোকন। তিনি আজ সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, স্বৈরাচারের সহযোগী হওয়ায় জাতীয় ছাত্রসমাজ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে সব ছাত্রসংগঠনের মধ্যে তখন ঐকমত্য হয়েছিল। সিদ্ধান্তটি ছিল, এই দুই সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারবে না৷

খায়রুল কবির আরও বলেন, ‘শিবির ও ছাত্রসমাজের বিষয়ে এখনকার ছাত্রসংগঠনগুলো কী আচরণ করবে, সে ব্যাপারে আমরা এখনকার ছাত্রসমাজের ওপরই আস্থা রাখতে চাই। আমরা দলীয় বা সাংগঠনিকভাবে এ বিষয়ে কিছু বলছি না৷’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ কলেজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাড়ে তিন দশকে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও বাম ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে শিবিরের সংঘর্ষ হয়েছে। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। এরপর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিচার করা হয়। কারও কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

বিগত সাড়ে ১৫ বছরে বিভিন্ন সময় বিএনপি ও জামায়াত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। তবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর বিএনপি জামায়াতের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে। গত ৩০ আগস্ট দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে তাঁদের জোট অনেক আগেই অকার্যকর হয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এখন প্রভাব আছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের। ছাত্রদলের সাংগঠনিক শক্তি রয়েছে। বাম ছাত্রসংগঠনগুলোও সক্রিয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অবস্থান হলো, তারা ক্যাম্পাসে কোনো দলের ছাত্রসংগঠনের রাজনীতি চায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের প্রকাশ্য রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের আপত্তি আছে। তবে নেতারা এখনই প্রকাশ্যে এ নিয়ে কথা বলতে রাজি নন।

ছাত্রদলের শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা আজ নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরকে প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে হলে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে তাদের অবস্থান প্রকাশ করতে হবে। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনগুলো এবং অন্যান্য অংশীজন মিলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।


আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে চাপা পড়েছে শিল্পকলার দুর্নীতি


 শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা ভবন

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জন্য টাকার অঙ্কে বরাদ্দ গত ১৫ বছরে বেড়েছে ১০ গুণ। প্রতিষ্ঠানটির জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেট ১০০ কোটি টাকার বেশি। কয়েক বছর ধরেই বছরব্যাপী বিপুল ব্যয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন কর্মশালা ও অনুষ্ঠান। দেশজুড়ে হয়েছে নাটক ও যাত্রাপালার আয়োজন। এসবের আড়ালে বারবার চাপা পড়েছে সোয়া দুই শ কোটি টাকার হিসাবের গরমিল, নিয়োগে অনিয়ম আর সাবেক মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর বহুমুখী স্বেচ্ছাচারিতার খবর। বরাদ্দের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিতে বেড়েছে দুর্নীতির পরিমাণও। এখন সেসব সংকটে জর্জরিত বাংলাদেশে সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৬ আগস্ট অন্তত ১৪ জন কর্মকর্তার কক্ষে তালা দেন প্রতিষ্ঠানেরই কিছু কর্মকর্তা। কয়েকজনকে কার্যালয়ে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

শিল্পকলা একাডেমির এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের। নতুন মহাপরিচালক দায়িত্ব নেওয়ার পর সবার সঙ্গে কথা বলছেন।